দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ পরিস্থিতি যেন দিন দিন আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম এবং এর উপসর্গে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। নতুন করে প্রায় দুই হাজার শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে উদ্বেগ।
শনিবার (২৩ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য। প্রতিবেদনের পর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে বাড়ছে চাপ, আর চিকিৎসকদের কপালেও দেখা দিয়েছে চিন্তার ভাঁজ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মারা যাওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে একজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল। বাকি ১২ শিশু হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে। এই দুই বিভাগে চারজন করে মোট আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বরিশালে দুইজন, চট্টগ্রামে দুইজন এবং ময়মনসিংহে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বরিশালে মারা যাওয়া দুই শিশুর মধ্যে একজনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। অন্যরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জটিল অবস্থায় চলে যাচ্ছে। ফলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও ১ হাজার ৯৬৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা কেবল সরকারি হিসাবে এসেছে। বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৬২ হাজার ৫০৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ শিশুকে।
তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। চিকিৎসা শেষে এ পর্যন্ত ৪৫ হাজার ১১ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হাজারো শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক অভিভাবক সন্তানকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। শিশুদের জ্বর, গায়ে লালচে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট ও দুর্বলতা নিয়ে ভিড় বাড়ছে জরুরি বিভাগগুলোতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বড় কারণে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে টিকাদানে ঘাটতি। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম প্রতিরোধী টিকা পায়নি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে এই সমস্যা বেশি।
করোনাকালের পর দেশের অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। সেই প্রভাব এখনো কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যও কিছু অভিভাবককে দ্বিধায় ফেলছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামকে অনেকে এখনো সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগ জটিল হয়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়, এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।”
হামের এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যখাত নয়, সামাজিক জীবনেও বড় চাপ তৈরি করছে। অনেক এলাকায় শিশুদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা। কোথাও কোথাও শিশুদের একসঙ্গে খেলাধুলাও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়—সচেতনতাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও টিকা নিলে এটি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শিশুমৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে ছোট শিশু রয়েছে, তারা এখন বেশি ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রম নতুন করে জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শিশুদের দ্রুত হাম প্রতিরোধী টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোনো শিশুর শরীরে জ্বর, লাল ফুসকুড়ি, চোখ লাল হওয়া বা কাশি দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে আলাদা প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে পরিবারগুলোর সচেতন হওয়া ছাড়া এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
চিকিৎসকদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং টিকাদান নিয়ে কোনো ধরনের গুজবে কান না দেওয়া।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ পরিস্থিতি যেন দিন দিন আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম এবং এর উপসর্গে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। নতুন করে প্রায় দুই হাজার শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে উদ্বেগ।
শনিবার (২৩ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য। প্রতিবেদনের পর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে বাড়ছে চাপ, আর চিকিৎসকদের কপালেও দেখা দিয়েছে চিন্তার ভাঁজ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মারা যাওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে একজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল। বাকি ১২ শিশু হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে। এই দুই বিভাগে চারজন করে মোট আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বরিশালে দুইজন, চট্টগ্রামে দুইজন এবং ময়মনসিংহে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বরিশালে মারা যাওয়া দুই শিশুর মধ্যে একজনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। অন্যরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জটিল অবস্থায় চলে যাচ্ছে। ফলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও ১ হাজার ৯৬৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা কেবল সরকারি হিসাবে এসেছে। বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৬২ হাজার ৫০৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ শিশুকে।
তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। চিকিৎসা শেষে এ পর্যন্ত ৪৫ হাজার ১১ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হাজারো শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক অভিভাবক সন্তানকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। শিশুদের জ্বর, গায়ে লালচে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট ও দুর্বলতা নিয়ে ভিড় বাড়ছে জরুরি বিভাগগুলোতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বড় কারণে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে টিকাদানে ঘাটতি। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম প্রতিরোধী টিকা পায়নি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে এই সমস্যা বেশি।
করোনাকালের পর দেশের অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। সেই প্রভাব এখনো কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যও কিছু অভিভাবককে দ্বিধায় ফেলছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামকে অনেকে এখনো সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগ জটিল হয়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়, এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।”
হামের এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যখাত নয়, সামাজিক জীবনেও বড় চাপ তৈরি করছে। অনেক এলাকায় শিশুদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা। কোথাও কোথাও শিশুদের একসঙ্গে খেলাধুলাও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়—সচেতনতাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও টিকা নিলে এটি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শিশুমৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে ছোট শিশু রয়েছে, তারা এখন বেশি ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রম নতুন করে জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শিশুদের দ্রুত হাম প্রতিরোধী টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোনো শিশুর শরীরে জ্বর, লাল ফুসকুড়ি, চোখ লাল হওয়া বা কাশি দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে আলাদা প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে পরিবারগুলোর সচেতন হওয়া ছাড়া এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
চিকিৎসকদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং টিকাদান নিয়ে কোনো ধরনের গুজবে কান না দেওয়া।

আপনার মতামত লিখুন