কুষ্টিয়ার খোকসায় কয়েক সেকেন্ডের আতঙ্ক কেড়ে নিল তিনটি প্রাণ। যাত্রীবোঝাই একটি বাস একটি ভ্যানকে বাঁচাতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের সঙ্গে। বিকট শব্দে সংঘর্ষের পর বাসটি সড়কের পাশের খাদে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলজুড়ে তখন শুধু মানুষের চিৎকার, রক্তাক্ত যাত্রী আর উদ্ধার চেষ্টার হাহাকার।
শনিবার (২৩ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের শিমুলিয়া কুটিপাড়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে রাফিয়া (১৫) নামে এক স্কুলছাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তানহা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়ার দিকে যাচ্ছিল। বাসটিতে প্রায় অর্ধশত যাত্রী ছিলেন। পথে একটি ভ্যান হঠাৎ সামনে চলে এলে সেটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন বাসচালক। ঠিক সেই মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা একটি বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের ধাক্কায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের গভীর খাদে পড়ে যায়। স্থানীয়রা বলছেন, দুর্ঘটনার শব্দ কয়েকশ গজ দূর থেকেও শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী মাজেদুল নামে এক পথচারী জানান, ট্রাকটি খুব দ্রুতগতিতে চলছিল। বাসচালক শেষ মুহূর্তে যাত্রী বাঁচানোর চেষ্টা করলেও সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি। তাঁর দাবি, ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই বাসটিকে ধাক্কা দেয়।
তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। আহতদের খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আরও এক ছাত্রী কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
নিহত রাফিয়া দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর মণ্ডলপাড়ার রুহুল আমিনের মেয়ে। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে পৌঁছালে সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অপর দুই নিহত পুরুষের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন।
খোকসা ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার আলতাব হোসেন বলেন, নিহত দুই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। তাঁদের স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করা হচ্ছে।
খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আরিফুল হক জানান, আহতদের অনেকের শরীরে গুরুতর আঘাত রয়েছে। অন্তত চারজনের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাঁদের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ইকবাল হাসান জানান, হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজন নারীর মৃত্যু হয়। বর্তমানে গুরুতর আহত চারজন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের অনেকেই মাথা, বুক ও হাত-পায়ে আঘাত পেয়েছেন। কয়েকজন যাত্রী দুর্ঘটনার সময় বাসের ভেতরে আটকে পড়েছিলেন বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতি, অনিয়ন্ত্রিত ভারী যান চলাচল, ফিটনেসবিহীন যান এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে ডাম্প ট্রাক ও বালুবাহী যানবাহনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া গতিতে চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব যানবাহনের চালকদের অনেকেই নিয়ম না মেনে গাড়ি চালান। ফলে সাধারণ যাত্রীদের জীবন প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে থাকছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সড়কে দীর্ঘ সময় কাজ করা চালকদের মধ্যে মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রবণতা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে যাত্রী পরিবহনে সময়ের প্রতিযোগিতাও চালকদের অতিরিক্ত গতির দিকে ঠেলে দেয়।
কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি ভ্যানকে বাঁচাতে গিয়ে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এরপর বাসটি খাদে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহন দুটি জব্দের প্রক্রিয়া চলছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত ও আইনি কার্যক্রম শেষ করে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অবহেলা বা নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ আছে কি না, সেটিও তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য ওই মহাসড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, এই সড়কে প্রায়ই ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। কিন্তু কার্যকর নজরদারি খুব কম দেখা যায়।
তাঁদের দাবি, শুধু দুর্ঘটনার পর অভিযান নয়, নিয়মিত তদারকি ও কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়।

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
কুষ্টিয়ার খোকসায় কয়েক সেকেন্ডের আতঙ্ক কেড়ে নিল তিনটি প্রাণ। যাত্রীবোঝাই একটি বাস একটি ভ্যানকে বাঁচাতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের সঙ্গে। বিকট শব্দে সংঘর্ষের পর বাসটি সড়কের পাশের খাদে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলজুড়ে তখন শুধু মানুষের চিৎকার, রক্তাক্ত যাত্রী আর উদ্ধার চেষ্টার হাহাকার।
শনিবার (২৩ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের শিমুলিয়া কুটিপাড়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে রাফিয়া (১৫) নামে এক স্কুলছাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তানহা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়ার দিকে যাচ্ছিল। বাসটিতে প্রায় অর্ধশত যাত্রী ছিলেন। পথে একটি ভ্যান হঠাৎ সামনে চলে এলে সেটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন বাসচালক। ঠিক সেই মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা একটি বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের ধাক্কায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের গভীর খাদে পড়ে যায়। স্থানীয়রা বলছেন, দুর্ঘটনার শব্দ কয়েকশ গজ দূর থেকেও শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী মাজেদুল নামে এক পথচারী জানান, ট্রাকটি খুব দ্রুতগতিতে চলছিল। বাসচালক শেষ মুহূর্তে যাত্রী বাঁচানোর চেষ্টা করলেও সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি। তাঁর দাবি, ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই বাসটিকে ধাক্কা দেয়।
তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। আহতদের খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আরও এক ছাত্রী কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
নিহত রাফিয়া দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর মণ্ডলপাড়ার রুহুল আমিনের মেয়ে। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে পৌঁছালে সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অপর দুই নিহত পুরুষের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন।
খোকসা ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার আলতাব হোসেন বলেন, নিহত দুই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। তাঁদের স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করা হচ্ছে।
খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আরিফুল হক জানান, আহতদের অনেকের শরীরে গুরুতর আঘাত রয়েছে। অন্তত চারজনের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাঁদের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ইকবাল হাসান জানান, হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজন নারীর মৃত্যু হয়। বর্তমানে গুরুতর আহত চারজন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের অনেকেই মাথা, বুক ও হাত-পায়ে আঘাত পেয়েছেন। কয়েকজন যাত্রী দুর্ঘটনার সময় বাসের ভেতরে আটকে পড়েছিলেন বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতি, অনিয়ন্ত্রিত ভারী যান চলাচল, ফিটনেসবিহীন যান এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে ডাম্প ট্রাক ও বালুবাহী যানবাহনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া গতিতে চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব যানবাহনের চালকদের অনেকেই নিয়ম না মেনে গাড়ি চালান। ফলে সাধারণ যাত্রীদের জীবন প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে থাকছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সড়কে দীর্ঘ সময় কাজ করা চালকদের মধ্যে মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রবণতা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে যাত্রী পরিবহনে সময়ের প্রতিযোগিতাও চালকদের অতিরিক্ত গতির দিকে ঠেলে দেয়।
কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি ভ্যানকে বাঁচাতে গিয়ে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এরপর বাসটি খাদে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহন দুটি জব্দের প্রক্রিয়া চলছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত ও আইনি কার্যক্রম শেষ করে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অবহেলা বা নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ আছে কি না, সেটিও তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য ওই মহাসড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, এই সড়কে প্রায়ই ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। কিন্তু কার্যকর নজরদারি খুব কম দেখা যায়।
তাঁদের দাবি, শুধু দুর্ঘটনার পর অভিযান নয়, নিয়মিত তদারকি ও কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়।

আপনার মতামত লিখুন