সিলেট বিভাগে হামের পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নতুন এই মৃত্যুর ঘটনায় বিভাগজুড়ে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮৩ জন সন্দেহভাজন রোগী। একই সঙ্গে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে।
শুক্রবার সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় প্রকাশিত ‘হাম ও রুবেলা রোগীর প্রতিবেদন-২০২৬’-এ উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু। বিশেষ করে যেসব শিশুর বয়স কম এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার আব্দুল মালিকের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে রাইসা, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইশাক আলীর ছয় বছর বয়সী ছেলে আলী আফসান, দিরাই উপজেলার মুসাদ্দিক মিয়ার ১০ মাস বয়সী মেয়ে মুসলিমা, সুনামগঞ্জ সদরের চার বছর দুই মাস বয়সী শামিমা এবং সিলেট সদরের বাহরাম আহমেদের এক বছর দুই মাস বয়সী ছেলে মো. রাশেদ আহমেদ।
তাদের মধ্যে রাইসা ও আলী আফসান মারা যায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মুসলিমা ও রাশেদের মৃত্যু হয় সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। আর শামিমা মারা যায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর আগে বেশিরভাগ শিশুর শরীরে জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব উপসর্গ হামজনিত জটিলতার সঙ্গে মিল রয়েছে। তবে কয়েকটি ঘটনা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৭৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ জন ভর্তি হয়েছে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২৮৩ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। শুধু শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালেই ভর্তি রয়েছে ৮০ জন রোগী। এছাড়া ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন অবস্থায় সময় কাটাচ্ছেন। কেউ সন্তানের জ্বর নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার শরীরে লালচে দানা ওঠার পর দ্রুত হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।
এক অভিভাবক বলেন, “প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবেছিলাম। পরে গায়ে দানা ওঠে। এরপর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তখন ভয় পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসি।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার এখনো শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হাম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত একজন শিশুর সংস্পর্শে এলে অন্য শিশুরাও সহজে আক্রান্ত হতে পারে। তাই শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা জরুরি।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো শুরুতে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয় এবং রোগের জটিলতা বাড়ে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাগজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে এবং আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, “হামের উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত হাসপাতালে আসা উচিত। শিশুদের জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের মধ্যে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু শুরুতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়, এটি সামাজিক সচেতনতারও একটি বড় পরীক্ষা। এখনও অনেক পরিবার টিকার বিষয়ে দ্বিধায় ভোগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্যও অনেক সময় মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তান অসুস্থ হওয়ার পর অনেক পরিবার প্রথমে বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে চায় বা গুরুত্ব কম দেয়। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার দরিদ্র পরিবারের অনেকেই অর্থসংকটের কারণে দ্রুত হাসপাতালে যেতে পারেন না।
এদিকে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সিলেটজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন অভিভাবকরা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
সিলেট বিভাগে হামের পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নতুন এই মৃত্যুর ঘটনায় বিভাগজুড়ে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮৩ জন সন্দেহভাজন রোগী। একই সঙ্গে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে।
শুক্রবার সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় প্রকাশিত ‘হাম ও রুবেলা রোগীর প্রতিবেদন-২০২৬’-এ উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু। বিশেষ করে যেসব শিশুর বয়স কম এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার আব্দুল মালিকের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে রাইসা, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইশাক আলীর ছয় বছর বয়সী ছেলে আলী আফসান, দিরাই উপজেলার মুসাদ্দিক মিয়ার ১০ মাস বয়সী মেয়ে মুসলিমা, সুনামগঞ্জ সদরের চার বছর দুই মাস বয়সী শামিমা এবং সিলেট সদরের বাহরাম আহমেদের এক বছর দুই মাস বয়সী ছেলে মো. রাশেদ আহমেদ।
তাদের মধ্যে রাইসা ও আলী আফসান মারা যায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মুসলিমা ও রাশেদের মৃত্যু হয় সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। আর শামিমা মারা যায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর আগে বেশিরভাগ শিশুর শরীরে জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব উপসর্গ হামজনিত জটিলতার সঙ্গে মিল রয়েছে। তবে কয়েকটি ঘটনা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৭৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ জন ভর্তি হয়েছে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২৮৩ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। শুধু শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালেই ভর্তি রয়েছে ৮০ জন রোগী। এছাড়া ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন অবস্থায় সময় কাটাচ্ছেন। কেউ সন্তানের জ্বর নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার শরীরে লালচে দানা ওঠার পর দ্রুত হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।
এক অভিভাবক বলেন, “প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবেছিলাম। পরে গায়ে দানা ওঠে। এরপর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তখন ভয় পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসি।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার এখনো শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হাম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত একজন শিশুর সংস্পর্শে এলে অন্য শিশুরাও সহজে আক্রান্ত হতে পারে। তাই শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা জরুরি।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো শুরুতে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয় এবং রোগের জটিলতা বাড়ে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাগজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে এবং আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, “হামের উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত হাসপাতালে আসা উচিত। শিশুদের জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের মধ্যে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু শুরুতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়, এটি সামাজিক সচেতনতারও একটি বড় পরীক্ষা। এখনও অনেক পরিবার টিকার বিষয়ে দ্বিধায় ভোগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্যও অনেক সময় মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তান অসুস্থ হওয়ার পর অনেক পরিবার প্রথমে বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে চায় বা গুরুত্ব কম দেয়। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার দরিদ্র পরিবারের অনেকেই অর্থসংকটের কারণে দ্রুত হাসপাতালে যেতে পারেন না।
এদিকে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সিলেটজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন অভিভাবকরা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন