আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, ঝুঁকিতে সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারাতে পারে। এতে দেশের প্রায় ১৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানি আয় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে নতুন বাজার খোঁজা এবং একাধিক বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দ্রুত এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হলেও এর সঙ্গে নতুন কিছু বাস্তবতাও তৈরি হবে। বর্তমানে বিভিন্ন উন্নত দেশে বাংলাদেশ যে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পাচ্ছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তার অনেকগুলো আর বহাল থাকবে না। ফলে রফতানিমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে পোশাক ও উৎপাদন খাতের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পায়। এই সুবিধা দেশের রফতানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে এসব সুবিধা উঠে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান সুবিধা হারানোর কারণে প্রায় সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়ের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং বাজার সম্প্রসারণের সফলতার ওপর।
সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে একাধিক কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে সংসদে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) চূড়ান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি সদস্য দেশগুলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো বড় অর্থনৈতিক বাজারের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা সেপা স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। নতুন নতুন দেশে প্রবেশ এবং উচ্চমূল্যের পণ্য রফতানির সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়বে।
দেশের বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গেও সংসদে কথা বলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি অতীতের কিছু নীতিগত দুর্বলতারও প্রভাব রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর ফলে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের বড় অংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এই খাতের প্রধান বাজার ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে গেলে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা ক্রেতাদের বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ নিজেই একটি ইতিবাচক অর্জন। কারণ এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মাথাপিছু আয় এবং সামাজিক উন্নয়নের প্রতিফলন। চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক প্রস্তুতি, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোর মাধ্যমে এই ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব।
বিশ্ব বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে শুধু শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, নতুন শিল্প খাত গড়ে তোলা এবং বহুমুখী রফতানি পণ্য তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের চলমান বাণিজ্য চুক্তি উদ্যোগগুলো সফল হলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য ক্ষতির বড় একটি অংশ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে। তবে এ জন্য সরকারি প্রস্তুতির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত বিশ্লেষকদের।
বাংলাদেশের জন্য এলডিসি উত্তরণ যেমন গর্বের অর্জন, তেমনি এটি নতুন এক অর্থনৈতিক পরীক্ষারও সূচনা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, ঝুঁকিতে সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারাতে পারে। এতে দেশের প্রায় ১৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানি আয় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে নতুন বাজার খোঁজা এবং একাধিক বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দ্রুত এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হলেও এর সঙ্গে নতুন কিছু বাস্তবতাও তৈরি হবে। বর্তমানে বিভিন্ন উন্নত দেশে বাংলাদেশ যে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পাচ্ছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তার অনেকগুলো আর বহাল থাকবে না। ফলে রফতানিমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে পোশাক ও উৎপাদন খাতের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পায়। এই সুবিধা দেশের রফতানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে এসব সুবিধা উঠে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান সুবিধা হারানোর কারণে প্রায় সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়ের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং বাজার সম্প্রসারণের সফলতার ওপর।
সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে একাধিক কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে সংসদে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) চূড়ান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি সদস্য দেশগুলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো বড় অর্থনৈতিক বাজারের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা সেপা স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। নতুন নতুন দেশে প্রবেশ এবং উচ্চমূল্যের পণ্য রফতানির সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়বে।
দেশের বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গেও সংসদে কথা বলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি অতীতের কিছু নীতিগত দুর্বলতারও প্রভাব রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর ফলে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের বড় অংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এই খাতের প্রধান বাজার ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে গেলে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা ক্রেতাদের বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ নিজেই একটি ইতিবাচক অর্জন। কারণ এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মাথাপিছু আয় এবং সামাজিক উন্নয়নের প্রতিফলন। চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক প্রস্তুতি, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোর মাধ্যমে এই ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব।
বিশ্ব বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে শুধু শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, নতুন শিল্প খাত গড়ে তোলা এবং বহুমুখী রফতানি পণ্য তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের চলমান বাণিজ্য চুক্তি উদ্যোগগুলো সফল হলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য ক্ষতির বড় একটি অংশ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে। তবে এ জন্য সরকারি প্রস্তুতির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত বিশ্লেষকদের।
বাংলাদেশের জন্য এলডিসি উত্তরণ যেমন গর্বের অর্জন, তেমনি এটি নতুন এক অর্থনৈতিক পরীক্ষারও সূচনা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন