পিআরআই সতর্কতা: প্রবৃদ্ধিমুখী ব্যয় বাড়ালে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে উল্টো বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতির চাপউচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা আর রাজস্ব ঘাটতির ভেতর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক মোড়ে যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ঝুঁকিপূর্ণ।
এই অবস্থায় সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে—এমন কঠোর সতর্কতা দিয়েছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।
সংস্থাটির মতে, এখন দরকার খরচ বাড়ানো নয়, বরং উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া।[TECHTARANGA-POST:1443]গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় উঠে আসে এই উদ্বেগ। সেখানে অর্থনীতিবিদরা বলেন, দেশের বর্তমান আর্থিক কাঠামো এতটাই চাপের মধ্যে আছে যে, ভুল নীতি পুরো অর্থনীতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।???? কেন ব্যয় বাড়ানো এখন ঝুঁকিপূর্ণ?পিআরআইয়ের সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ) এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিএফএটি’র যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় বলা হয়—বাংলাদেশ এখন একাধিক অর্থনৈতিক চাপে আছে একসঙ্গে।মূল অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান জানান, বর্তমানে সরকারের নীতিগত সুযোগ অনেকটাই সীমিত। কারণ—
মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চমাত্রায়
সুদ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে
ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা ঋণ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে
তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে যদি শুধু চাহিদা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে বাজারে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “শুধু ব্যয় বাড়িয়ে এই সংকট থেকে বের হওয়া যাবে না। এখন দরকার উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।”???? বাজেট নিয়ে নতুন বার্তা: কোথায় কাটছাঁট, কোথায় সুরক্ষাআলোচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কেন্দ্র করেও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উঠে আসে।ড. আশিকুর রহমান বলেন, বাজেটে সরকারের উচিত—
রাজস্ব আদায় শক্তিশালী করা
অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা
ভর্তুকি যৌক্তিক করা
ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো
তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করেন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতে ব্যয় কমানো যাবে না।অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে বাজেট নিজেই চাপ তৈরি করতে পারে।???? রপ্তানি ও বাজার নিয়ে গভীর উদ্বেগপিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার আলোচনায় বলেন, বাংলাদেশ অতীতে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখালেও এখন প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে।তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগে দুর্বলতা এবং বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার।[TECHTARANGA-POST:1436]তিনি বলেন, “শুধু দেশের ভেতরের বাজারের ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।”তিনি আরও উল্লেখ করেন—
বাণিজ্য-জিডিপি অনুপাত কমে ৩০–৩১ শতাংশে নেমে এসেছে
উচ্চ শুল্ক কাঠামোর কারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পিছিয়ে আছে
বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার দরকার
তার মতে, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।???? ব্যাংক ও প্রকল্প বাস্তবায়নে চাপে অর্থনীতিসেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের সংস্কার উদ্যোগগুলো অনেক সময় বাস্তবে রূপ নেয় না।তিনি বলেন—
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতির
পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না
এর ফলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।তার মতে, ব্যাংকিং, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাত যদি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক না হয়, তাহলে বিনিয়োগ আরও কমে যাবে।⚠️ অর্থনীতির ভেতরের চাপ কোথায় যাচ্ছে?অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে—বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একসঙ্গে কয়েকটি চাপে আটকে আছে।
একদিকে মূল্যস্ফীতি
অন্যদিকে বিনিয়োগ স্থবিরতা
পাশাপাশি রাজস্ব ঘাটতি
এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা
এই চারটি চাপ একসঙ্গে থাকায় নীতি গ্রহণে ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।???? কেন বারবার একই সংকট ফিরে আসে? (বিশ্লেষণ)অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা হলো কাঠামোগত দুর্বলতা।
অনেক সময় স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা উপেক্ষিত হয়।ফলে—
বিনিয়োগ বাড়ে না
উৎপাদন সক্ষমতা স্থবির থাকে
রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায়
এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে
মানসিক ও অর্থনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংকটের সময় সরকার সাধারণত দ্রুত ফলের জন্য ব্যয় বাড়ায়। কিন্তু যদি সেই ব্যয় উৎপাদনশীল খাতে না যায়, তাহলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ তৈরি হয়—যা দাম বাড়িয়ে দেয়।[TECHTARANGA-POST:1377]???? শেষ কথা: প্রবৃদ্ধির চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন স্থিতিশীলতাঅর্থনীতিবিদদের একটাই বার্তা—এখন সময় শুধু “বেশি খরচ করে বেশি প্রবৃদ্ধি” নয়, বরং “স্মার্ট খরচ করে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি” নিশ্চিত করা।
নাহলে প্রবৃদ্ধির অঙ্ক বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ কমবে না—বরং মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।