ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে বিচার চান পরিবার, তবে হাসপাতাল বন্ধ নয়; ক্ষতিপূরণ ও চাকরির ঘোষণা আদ্-দ্বীনের
রাজধানীর একটি হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে নয়। তাদের দাবি, প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, কিন্তু একটি ঘটনার জন্য পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে সাধারণ রোগীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অবস্থান তুলে ধরেন নিহত শিশুদের কয়েকজন অভিভাবক। সেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ভুক্তভোগী পরিবার এবং তাদের আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
মারা যাওয়া এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, তাদের মূল দাবি হলো প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা। তবে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার দাবির সঙ্গে তারা একমত নন।
তার ভাষ্য, এর আগেও তার পরিবারের দুটি সন্তানের জন্ম একই হাসপাতালে হয়েছে এবং তারা সুস্থ রয়েছে। ফলে একটি মর্মান্তিক ঘটনার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে বহু রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তারা আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত চান না। বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে, সেটির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চান।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের পক্ষে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে শিশুদের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ওয়ার্ডে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তার দাবি, প্রতিবেদনে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক কত ছিল বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। একই সঙ্গে কতটুকু অক্সিজেনের ঘাটতি নবজাতকদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তার মতে, এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। ফলে বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে এবং আরও বিশদ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। সেই নোটিশের জবাব আগামী রোববার বিকেল ৫টার মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, জবাব সন্তোষজনক না হলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছে।
তাদের দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া আইনসম্মত নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে এবং নিজেদের অবস্থান লিখিতভাবে তুলে ধরবে।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কয়েকটি সহায়তা কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।
এর মধ্যে রয়েছে নিহত শিশুদের পরিবারের সদস্যদের আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং প্রতিটি পরিবার থেকে একজন সদস্যকে চাকরির সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
যদিও এসব ঘোষণা নিয়ে পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন, তবে অধিকাংশের বক্তব্য—আর্থিক সহায়তা বা চাকরি তাদের সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাদের প্রধান চাওয়া সত্য উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, অক্সিজেন সরবরাহ এবং নবজাতক পরিচর্যা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক না কেন, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামান্য ঘাটতিও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
নবজাতকরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী হওয়ায় তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, সঠিক মনিটরিং এবং প্রশিক্ষিত জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি জায়গায় ব্যত্যয় ঘটলে অল্প সময়ের মধ্যেই সংকট তৈরি হতে পারে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি চেয়েছেন, আবার কেউ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো পক্ষকে দায়ী করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
গত ২৭ মে ভোরে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি।
এদিকে সন্তান হারানো পরিবারগুলো বলছে, তারা কোনো পক্ষের হয়ে নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে চান। তাদের প্রত্যাশা—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ সামনে আসবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখোমুখি হতে হবে না।

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে বিচার চান পরিবার, তবে হাসপাতাল বন্ধ নয়; ক্ষতিপূরণ ও চাকরির ঘোষণা আদ্-দ্বীনের
রাজধানীর একটি হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে নয়। তাদের দাবি, প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, কিন্তু একটি ঘটনার জন্য পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে সাধারণ রোগীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অবস্থান তুলে ধরেন নিহত শিশুদের কয়েকজন অভিভাবক। সেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ভুক্তভোগী পরিবার এবং তাদের আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
মারা যাওয়া এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, তাদের মূল দাবি হলো প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা। তবে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার দাবির সঙ্গে তারা একমত নন।
তার ভাষ্য, এর আগেও তার পরিবারের দুটি সন্তানের জন্ম একই হাসপাতালে হয়েছে এবং তারা সুস্থ রয়েছে। ফলে একটি মর্মান্তিক ঘটনার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে বহু রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তারা আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত চান না। বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে, সেটির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চান।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের পক্ষে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে শিশুদের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ওয়ার্ডে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তার দাবি, প্রতিবেদনে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক কত ছিল বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। একই সঙ্গে কতটুকু অক্সিজেনের ঘাটতি নবজাতকদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তার মতে, এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। ফলে বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে এবং আরও বিশদ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। সেই নোটিশের জবাব আগামী রোববার বিকেল ৫টার মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, জবাব সন্তোষজনক না হলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছে।
তাদের দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া আইনসম্মত নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে এবং নিজেদের অবস্থান লিখিতভাবে তুলে ধরবে।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কয়েকটি সহায়তা কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।
এর মধ্যে রয়েছে নিহত শিশুদের পরিবারের সদস্যদের আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং প্রতিটি পরিবার থেকে একজন সদস্যকে চাকরির সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
যদিও এসব ঘোষণা নিয়ে পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন, তবে অধিকাংশের বক্তব্য—আর্থিক সহায়তা বা চাকরি তাদের সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাদের প্রধান চাওয়া সত্য উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, অক্সিজেন সরবরাহ এবং নবজাতক পরিচর্যা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক না কেন, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামান্য ঘাটতিও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
নবজাতকরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী হওয়ায় তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, সঠিক মনিটরিং এবং প্রশিক্ষিত জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি জায়গায় ব্যত্যয় ঘটলে অল্প সময়ের মধ্যেই সংকট তৈরি হতে পারে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি চেয়েছেন, আবার কেউ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো পক্ষকে দায়ী করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
গত ২৭ মে ভোরে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি।
এদিকে সন্তান হারানো পরিবারগুলো বলছে, তারা কোনো পক্ষের হয়ে নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে চান। তাদের প্রত্যাশা—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ সামনে আসবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখোমুখি হতে হবে না।

আপনার মতামত লিখুন