দিনভর শ্রমিকের কাজ শেষে ঘরে ফিরতেন রনি। দরজা খুলতেই ছোট্ট মেয়ে লামিয়া বাবাকে দেখে মুচকি হেসে উঠত। সেই হাসিই ছিল ক্লান্ত শরীরের সবচেয়ে বড় ওষুধ। কিন্তু আজ আর সেই হাসি নেই। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে লামিয়ার জামা, খেলনা আর স্মৃতি। আর সেগুলো বুকে জড়িয়ে প্রতিদিন কান্না করেন মা রোজিনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিরহামপুর গ্রামের এই পরিবারটি এখন শুধু একটি নাম উচ্চারণ করে—লামিয়া। যে শিশুকে ঘিরে ছিল স্বপ্ন, তাকে কেড়ে নিয়েছে হাম।
লামিয়া একা নয়। দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ বিস্তারে প্রাণ হারিয়েছে ৬০০-এর বেশি শিশু। হাসপাতালের বেড থেকে শুরু করে গ্রামের কাঁচা ঘর—সবখানেই এখন একই গল্প। কোথাও সন্তান হারানোর শোক, কোথাও আক্রান্ত শিশুকে বাঁচানোর মরিয়া লড়াই।
সরকারি খাস জমিতে গড়ে ওঠা ছোট্ট ঘরে বসবাস করতেন রোজিনা ও রনি দম্পতি। দিনমজুরির আয়েই চলত সংসার। অভাব ছিল, কিন্তু সুখ ছিল তাদের একমাত্র সন্তানকে ঘিরে।
রনি বলেন, মেয়ের হাসি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে মেয়েকে কোলে নিলে সব কষ্ট ভুলে যেতেন। কিন্তু হামের সংক্রমণে সেই সুখের সংসার মুহূর্তেই শোকে ডুবে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্তান হারানোর পর থেকে পরিবারটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। মা রোজিনা প্রায়ই মেয়ের জামাকাপড় ও খেলনা বুকে নিয়ে কান্না করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত দেশের ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩ শিশুকে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে। এত বড় কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদের মতে, হামের টিকার ক্ষেত্রে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কম হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তার দাবি, পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা ছাড়া টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ায় অনেক অভিভাবক টিকা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। বিশেষ করে বয়সসীমার পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রচারণা আরও জোরালো হলে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি সচেতনতা কার্যক্রম চালালে কভারেজ বাড়ানো সম্ভব হতো।
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে আট মাস বয়সী আয়ান হাওলাদার। কয়েকদিন ধরে উচ্চ জ্বর ও জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি সে।
বিছানার পাশে বসে থাকা মা সুমাইয়া জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে তাদের পরিবারের স্বাভাবিক জীবন থেমে গেছে। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক সংকটও তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, সন্তানের কষ্ট দেখে বাবা-মা অসহায় হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধারদেনাও করতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, অপুষ্টি ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টি, অসম্পূর্ণ টিকাদান, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধুমাত্র টিকা প্রদান যথেষ্ট নয়। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আলাদা নজরদারিতে রাখা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসা সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
তার মতে, মহামারি মোকাবিলার মতো সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
হামের সবচেয়ে বড় আঘাত কেবল মৃত্যুর সংখ্যা নয়; এর পেছনে ভেঙে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু, ভবিষ্যতের মৃত্যু, বহু বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি।
গ্রাম থেকে শহর—অনেক পরিবার বছরের পর বছর অপেক্ষার পর সন্তান পেয়েছিল। এখন সেই সন্তানকে হারিয়ে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তান হারানোর শোক অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাতে পরিণত হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে টিকাদানের কভারেজ আরও বাড়ানো, বাড়ি বাড়ি সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
তাদের মতে, হামকে শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন সামাজিক ও মানবিক সংকটেও পরিণত হয়েছে।
কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে একটি শিশুর মুখ, একটি মায়ের কান্না এবং একটি পরিবারের অপূর্ণ স্বপ্ন। আর সেই কারণেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
দিনভর শ্রমিকের কাজ শেষে ঘরে ফিরতেন রনি। দরজা খুলতেই ছোট্ট মেয়ে লামিয়া বাবাকে দেখে মুচকি হেসে উঠত। সেই হাসিই ছিল ক্লান্ত শরীরের সবচেয়ে বড় ওষুধ। কিন্তু আজ আর সেই হাসি নেই। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে লামিয়ার জামা, খেলনা আর স্মৃতি। আর সেগুলো বুকে জড়িয়ে প্রতিদিন কান্না করেন মা রোজিনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিরহামপুর গ্রামের এই পরিবারটি এখন শুধু একটি নাম উচ্চারণ করে—লামিয়া। যে শিশুকে ঘিরে ছিল স্বপ্ন, তাকে কেড়ে নিয়েছে হাম।
লামিয়া একা নয়। দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ বিস্তারে প্রাণ হারিয়েছে ৬০০-এর বেশি শিশু। হাসপাতালের বেড থেকে শুরু করে গ্রামের কাঁচা ঘর—সবখানেই এখন একই গল্প। কোথাও সন্তান হারানোর শোক, কোথাও আক্রান্ত শিশুকে বাঁচানোর মরিয়া লড়াই।
সরকারি খাস জমিতে গড়ে ওঠা ছোট্ট ঘরে বসবাস করতেন রোজিনা ও রনি দম্পতি। দিনমজুরির আয়েই চলত সংসার। অভাব ছিল, কিন্তু সুখ ছিল তাদের একমাত্র সন্তানকে ঘিরে।
রনি বলেন, মেয়ের হাসি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে মেয়েকে কোলে নিলে সব কষ্ট ভুলে যেতেন। কিন্তু হামের সংক্রমণে সেই সুখের সংসার মুহূর্তেই শোকে ডুবে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্তান হারানোর পর থেকে পরিবারটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। মা রোজিনা প্রায়ই মেয়ের জামাকাপড় ও খেলনা বুকে নিয়ে কান্না করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত দেশের ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩ শিশুকে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে। এত বড় কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদের মতে, হামের টিকার ক্ষেত্রে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কম হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তার দাবি, পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা ছাড়া টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ায় অনেক অভিভাবক টিকা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। বিশেষ করে বয়সসীমার পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রচারণা আরও জোরালো হলে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি সচেতনতা কার্যক্রম চালালে কভারেজ বাড়ানো সম্ভব হতো।
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে আট মাস বয়সী আয়ান হাওলাদার। কয়েকদিন ধরে উচ্চ জ্বর ও জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি সে।
বিছানার পাশে বসে থাকা মা সুমাইয়া জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে তাদের পরিবারের স্বাভাবিক জীবন থেমে গেছে। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক সংকটও তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, সন্তানের কষ্ট দেখে বাবা-মা অসহায় হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধারদেনাও করতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, অপুষ্টি ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টি, অসম্পূর্ণ টিকাদান, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধুমাত্র টিকা প্রদান যথেষ্ট নয়। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আলাদা নজরদারিতে রাখা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসা সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
তার মতে, মহামারি মোকাবিলার মতো সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
হামের সবচেয়ে বড় আঘাত কেবল মৃত্যুর সংখ্যা নয়; এর পেছনে ভেঙে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু, ভবিষ্যতের মৃত্যু, বহু বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি।
গ্রাম থেকে শহর—অনেক পরিবার বছরের পর বছর অপেক্ষার পর সন্তান পেয়েছিল। এখন সেই সন্তানকে হারিয়ে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তান হারানোর শোক অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাতে পরিণত হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে টিকাদানের কভারেজ আরও বাড়ানো, বাড়ি বাড়ি সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
তাদের মতে, হামকে শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন সামাজিক ও মানবিক সংকটেও পরিণত হয়েছে।
কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে একটি শিশুর মুখ, একটি মায়ের কান্না এবং একটি পরিবারের অপূর্ণ স্বপ্ন। আর সেই কারণেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আপনার মতামত লিখুন