বাংলাদেশের জন্য International Monetary Fund (আইএমএফ)-এর ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কারসহ একাধিক শর্ত পূরণ না হওয়ায় জুনের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় পাওয়া যাবে কি না—তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভা শেষে দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে এবং দুই পক্ষ সব বিষয়ে একমত হতে পারেনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো দানভিত্তিক নয়, এটি একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক। তাই দেশের স্বার্থের বাইরে গিয়ে সব শর্ত মেনে নেওয়ার প্রশ্ন নেই।
অর্থমন্ত্রী জানান, আলোচনাগুলো আরও ১৫ থেকে ২০ দিন চলতে পারে, এমনকি এক মাসও সময় লাগতে পারে। আইএমএফ কী চাচ্ছে এবং সরকারের অবস্থান কী হবে—তা যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখনো মোট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হবে আগামী জানুয়ারিতে। তবে এর আগে জুন মাসের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় পাওয়ার আশা থাকলেও তা সময়মতো মিলবে কি না—সেটি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব খাত সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এসব শর্ত পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা না করে তারা নতুন কিস্তি ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।
এর আগে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেও জুনে কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, নতুন সরকারের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের এটি উপযুক্ত সময়।
তবে সরকার বলছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘ঋণের কিস্তি স্থগিত হয়েছে’—এ ধরনের খবর সঠিক নয়। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং জানিয়েছে, আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ইতিবাচক পরিবেশে হয়েছে এবং কোনো কিস্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান ঋণ কর্মসূচিটি আগের সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে অনেক শর্ত রয়েছে। এর সবগুলো বর্তমান সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ পড়ে—এমন সিদ্ধান্ত সরকার নিতে চায় না বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে Centre for Policy Dialogue (সিপিডি)-র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার কার্যক্রম অনেকটাই থেমে ছিল। ব্যাংক খাতে কিছু উদ্যোগ থাকলেও রাজস্ব খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এসব কারণেই আইএমএফ এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, আইএমএফ সাধারণত কোনো দেশকে ঋণ দেওয়ার সময় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের শর্ত দেয়। এসব শর্তের মধ্যে থাকে কর আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করা এবং ভর্তুকি কমানো—যাতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে—একদিকে আইএমএফের শর্ত মেনে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে নতুন করে আলোচনা করে ভিন্ন শর্তে এগোনোর চেষ্টা করা। শেষ পর্যন্ত কোন পথে সরকার যাবে, তা নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ফলাফলের ওপর। তাই আইএমএফ ঋণের পরবর্তী কিস্তি পাওয়া নিয়ে এখনো অপেক্ষা ও আলোচনার পথই খোলা রয়েছে।

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের জন্য International Monetary Fund (আইএমএফ)-এর ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কারসহ একাধিক শর্ত পূরণ না হওয়ায় জুনের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় পাওয়া যাবে কি না—তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভা শেষে দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে এবং দুই পক্ষ সব বিষয়ে একমত হতে পারেনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো দানভিত্তিক নয়, এটি একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক। তাই দেশের স্বার্থের বাইরে গিয়ে সব শর্ত মেনে নেওয়ার প্রশ্ন নেই।
অর্থমন্ত্রী জানান, আলোচনাগুলো আরও ১৫ থেকে ২০ দিন চলতে পারে, এমনকি এক মাসও সময় লাগতে পারে। আইএমএফ কী চাচ্ছে এবং সরকারের অবস্থান কী হবে—তা যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখনো মোট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হবে আগামী জানুয়ারিতে। তবে এর আগে জুন মাসের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় পাওয়ার আশা থাকলেও তা সময়মতো মিলবে কি না—সেটি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব খাত সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এসব শর্ত পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা না করে তারা নতুন কিস্তি ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।
এর আগে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেও জুনে কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, নতুন সরকারের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের এটি উপযুক্ত সময়।
তবে সরকার বলছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘ঋণের কিস্তি স্থগিত হয়েছে’—এ ধরনের খবর সঠিক নয়। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং জানিয়েছে, আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ইতিবাচক পরিবেশে হয়েছে এবং কোনো কিস্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান ঋণ কর্মসূচিটি আগের সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে অনেক শর্ত রয়েছে। এর সবগুলো বর্তমান সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ পড়ে—এমন সিদ্ধান্ত সরকার নিতে চায় না বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে Centre for Policy Dialogue (সিপিডি)-র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার কার্যক্রম অনেকটাই থেমে ছিল। ব্যাংক খাতে কিছু উদ্যোগ থাকলেও রাজস্ব খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এসব কারণেই আইএমএফ এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, আইএমএফ সাধারণত কোনো দেশকে ঋণ দেওয়ার সময় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের শর্ত দেয়। এসব শর্তের মধ্যে থাকে কর আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করা এবং ভর্তুকি কমানো—যাতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে—একদিকে আইএমএফের শর্ত মেনে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে নতুন করে আলোচনা করে ভিন্ন শর্তে এগোনোর চেষ্টা করা। শেষ পর্যন্ত কোন পথে সরকার যাবে, তা নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ফলাফলের ওপর। তাই আইএমএফ ঋণের পরবর্তী কিস্তি পাওয়া নিয়ে এখনো অপেক্ষা ও আলোচনার পথই খোলা রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন