একজন প্রবীণ নারী আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনে মতিঝিল যাওয়ার জন্য এসেছিলেন। ভাড়ায় প্রবীণ নাগরিকদের ছাড় পাওয়ার কথা জানিয়ে সহযোগিতা চেয়েছিলেন স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর কাছে। কিন্তু তার অভিযোগ, সহযোগিতার বদলে তাকে বলা হয়, ‘আপনি অন্যদিকে যান, এখানে এসব হবে না।’
ওই নারী বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সাবেক মহাব্যবস্থাপক মঞ্জু আরা বেগম। তার অভিজ্ঞতা যেন একটি বড় বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি—দেশে মানুষের আয়ু বাড়ছে, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে; কিন্তু তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ আবাসন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কি সেই গতিতে এগোচ্ছে?
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘দ্য এজ অব লংজিভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’, অর্থাৎ ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। এবারের বার্তাটি তাই শুধু প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষ দীর্ঘদিন বাঁচবে—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে স্বাস্থ্য, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যবস্থাগুলো নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের প্রবীণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০০১ সালে এই হার ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থাৎ দুই দশকের ব্যবধানে দেশের জনসংখ্যায় প্রবীণদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই পরিবর্তন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার অর্থ হলো—স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, উপযুক্ত আবাসন, গণপরিবহন, কর্মসংস্থান ও পারিবারিক যত্নের প্রয়োজনও বাড়বে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২০ কোটি। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ দীর্ঘায়ু এখন শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও নতুন ধরনের পরিকল্পনার বিষয়।
বাংলাদেশে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম সরকারি কর্মসূচি বয়স্কভাতা। দরিদ্র ও স্বল্প উপার্জনক্ষম বা উপার্জনে অক্ষম প্রবীণদের সহায়তার লক্ষ্যেই ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এ কর্মসূচি চালু হয়।
তবে প্রবীণদের প্রয়োজন কেবল মাসিক আর্থিক সহায়তায় শেষ হয় না।
স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত ওষুধ, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ বাসস্থান, সহজে চলাচলের ব্যবস্থা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং পরিবারে সম্মানজনক অবস্থান—সবকিছুকেই প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
মঞ্জু আরা বেগমের কথাতেই এর একটি বাস্তব দিক উঠে আসে। তিনি জানান, তার নিজের ওষুধে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং স্বামীর ওষুধে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এমন ব্যয় দীর্ঘদিন বহন করা কঠিন।
অর্থাৎ একজন প্রবীণ দরিদ্র না হলেও তিনি আর্থিকভাবে নিরাপদ—এমন ধারণা সব সময় বাস্তবসম্মত নয়।
প্রবীণদের জীবনে আরেকটি বড় সংকট হলো নিঃসঙ্গতা।
প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামীমা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমসে থাকছেন। তার স্বামী-সন্তানেরা বছরে দুবার তাকে দেখতে আসেন। জীবনের শেষ সময়ে দেশ, পরিচিত পরিবেশ ও দেশীয় খাবারের মধ্যে থাকতে চেয়েছেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে এসে তিনি স্বস্তিতে আছেন; একই সঙ্গে পরিবারও তাকে নিয়ে তুলনামূলক নিশ্চিন্তে থাকতে পারছে।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদও সস্ত্রীক সেখানে বসবাস করছেন। তিনি মনে করেন, শিশু থেকে প্রবীণ—প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক মর্যাদায় বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
তার মতে, অতীতের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়ায় প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা বেড়েছে। সন্তানরা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, নাতি-নাতনিরাও পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত। স্বামী বা স্ত্রীর একজন মারা গেলে অন্যজনের একাকিত্ব আরও বাড়তে পারে।
এই একাকিত্ব সব সময় অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অর্থ-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও একজন প্রবীণ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজনীয়তাও দিন দিন সামনে আসছে।
জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হাসপাতাল (জেবিএফআরএইচ) প্রতিষ্ঠা করেছেন অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৭০০ বর্গফুটের ২৩২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ২২৪টি বিক্রি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশা ইসলাম নাঈমের বাবা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ‘বাংলাপিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম এই প্রবীণ নিবাসের প্রথম বাসিন্দা। তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত।
আশা ইসলাম নাঈম জানান, তার বাবা আগে প্রায়ই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন। এতে পরিবারকে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হতো। প্রবীণ নিবাসে আসার পর তিনি অন্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারছেন এবং পরিবারও কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈমের মতে, প্রবীণসেবা বলতে শুধু দরিদ্র মানুষের থাকা-খাওয়া বা চিকিৎসাকে বোঝালে চলবে না। সচ্ছল পরিবারের প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের মতে, প্রবীণের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। পরিবার সেই দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে।
দেশে কিছু সামাজিক সংগঠন ও এনজিও প্রবীণদের নিয়ে কাজ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে সব প্রবীণ নিবাসকে এক চোখে দেখার সুযোগ নেই; কোথাও ভালো সেবা থাকলেও কোথাও প্রবীণসেবা মূল লক্ষ্য না হয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—প্রবীণদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব কি না, যেখানে তারা পরিবারের সঙ্গে থাকলেও নিরাপদ থাকবেন, আবার প্রয়োজন হলে মানসম্মত বিকল্প আবাসন ও পরিচর্যাও পাবেন।
প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার বিষয়টি শুধু বৃদ্ধাশ্রম বা ভাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রবীণ যখন বাস, মেট্রোরেল বা অন্য কোনো গণপরিবহন ব্যবহার করবেন, তখন তার জন্য সহজ নির্দেশনা, বসার সুযোগ, ছাড় পাওয়ার প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় সহায়তা থাকা দরকার।
হাসপাতালেও প্রবীণ রোগীর জন্য আলাদা সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে ফুটপাত, রাস্তা, সরকারি কার্যালয় ও বিনোদনস্থল—সব জায়গায় প্রবীণদের চলাচলের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা দরকার।
কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমতে পারে, কিন্তু তার নাগরিক অধিকার কমে যায় না।
প্রবীণ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পৃথক বাণীতেও প্রবীণদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে আপনার সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বাণীতে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতার বিষয়টি তুলে ধরে তাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, বয়স্কভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের মূল বার্তাটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আজকের ছোট সমস্যা আগামী দিনে বড় সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।
প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বিনিয়োগ। আজ যারা তরুণ, একদিন তারাও প্রবীণ হবেন। তাই প্রশ্নটি শুধু ‘প্রবীণদের কী দেওয়া হবে’—এভাবে দেখলে হবে না; বরং ‘আমরা কেমন সমাজে নিজের বার্ধক্য কাটাতে চাই’—সেই প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।
ভাতা দরকার, কিন্তু তার পাশাপাশি প্রয়োজন সাশ্রয়ী চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ আবাসন, সহজ গণপরিবহন, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সবচেয়ে বড় কথা—পরিবার ও সমাজে সম্মানের জায়গা। দীর্ঘায়ু তখনই অর্থবহ হবে, যখন দীর্ঘ জীবন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণও হবে।

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
একজন প্রবীণ নারী আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনে মতিঝিল যাওয়ার জন্য এসেছিলেন। ভাড়ায় প্রবীণ নাগরিকদের ছাড় পাওয়ার কথা জানিয়ে সহযোগিতা চেয়েছিলেন স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর কাছে। কিন্তু তার অভিযোগ, সহযোগিতার বদলে তাকে বলা হয়, ‘আপনি অন্যদিকে যান, এখানে এসব হবে না।’
ওই নারী বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সাবেক মহাব্যবস্থাপক মঞ্জু আরা বেগম। তার অভিজ্ঞতা যেন একটি বড় বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি—দেশে মানুষের আয়ু বাড়ছে, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে; কিন্তু তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ আবাসন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কি সেই গতিতে এগোচ্ছে?
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘দ্য এজ অব লংজিভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’, অর্থাৎ ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। এবারের বার্তাটি তাই শুধু প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষ দীর্ঘদিন বাঁচবে—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে স্বাস্থ্য, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যবস্থাগুলো নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের প্রবীণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০০১ সালে এই হার ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থাৎ দুই দশকের ব্যবধানে দেশের জনসংখ্যায় প্রবীণদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই পরিবর্তন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার অর্থ হলো—স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, উপযুক্ত আবাসন, গণপরিবহন, কর্মসংস্থান ও পারিবারিক যত্নের প্রয়োজনও বাড়বে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২০ কোটি। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ দীর্ঘায়ু এখন শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও নতুন ধরনের পরিকল্পনার বিষয়।
বাংলাদেশে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম সরকারি কর্মসূচি বয়স্কভাতা। দরিদ্র ও স্বল্প উপার্জনক্ষম বা উপার্জনে অক্ষম প্রবীণদের সহায়তার লক্ষ্যেই ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এ কর্মসূচি চালু হয়।
তবে প্রবীণদের প্রয়োজন কেবল মাসিক আর্থিক সহায়তায় শেষ হয় না।
স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত ওষুধ, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ বাসস্থান, সহজে চলাচলের ব্যবস্থা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং পরিবারে সম্মানজনক অবস্থান—সবকিছুকেই প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
মঞ্জু আরা বেগমের কথাতেই এর একটি বাস্তব দিক উঠে আসে। তিনি জানান, তার নিজের ওষুধে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং স্বামীর ওষুধে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এমন ব্যয় দীর্ঘদিন বহন করা কঠিন।
অর্থাৎ একজন প্রবীণ দরিদ্র না হলেও তিনি আর্থিকভাবে নিরাপদ—এমন ধারণা সব সময় বাস্তবসম্মত নয়।
প্রবীণদের জীবনে আরেকটি বড় সংকট হলো নিঃসঙ্গতা।
প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামীমা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমসে থাকছেন। তার স্বামী-সন্তানেরা বছরে দুবার তাকে দেখতে আসেন। জীবনের শেষ সময়ে দেশ, পরিচিত পরিবেশ ও দেশীয় খাবারের মধ্যে থাকতে চেয়েছেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে এসে তিনি স্বস্তিতে আছেন; একই সঙ্গে পরিবারও তাকে নিয়ে তুলনামূলক নিশ্চিন্তে থাকতে পারছে।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদও সস্ত্রীক সেখানে বসবাস করছেন। তিনি মনে করেন, শিশু থেকে প্রবীণ—প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক মর্যাদায় বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
তার মতে, অতীতের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়ায় প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা বেড়েছে। সন্তানরা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, নাতি-নাতনিরাও পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত। স্বামী বা স্ত্রীর একজন মারা গেলে অন্যজনের একাকিত্ব আরও বাড়তে পারে।
এই একাকিত্ব সব সময় অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অর্থ-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও একজন প্রবীণ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজনীয়তাও দিন দিন সামনে আসছে।
জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হাসপাতাল (জেবিএফআরএইচ) প্রতিষ্ঠা করেছেন অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৭০০ বর্গফুটের ২৩২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ২২৪টি বিক্রি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশা ইসলাম নাঈমের বাবা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ‘বাংলাপিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম এই প্রবীণ নিবাসের প্রথম বাসিন্দা। তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত।
আশা ইসলাম নাঈম জানান, তার বাবা আগে প্রায়ই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন। এতে পরিবারকে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হতো। প্রবীণ নিবাসে আসার পর তিনি অন্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারছেন এবং পরিবারও কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈমের মতে, প্রবীণসেবা বলতে শুধু দরিদ্র মানুষের থাকা-খাওয়া বা চিকিৎসাকে বোঝালে চলবে না। সচ্ছল পরিবারের প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের মতে, প্রবীণের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। পরিবার সেই দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে।
দেশে কিছু সামাজিক সংগঠন ও এনজিও প্রবীণদের নিয়ে কাজ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে সব প্রবীণ নিবাসকে এক চোখে দেখার সুযোগ নেই; কোথাও ভালো সেবা থাকলেও কোথাও প্রবীণসেবা মূল লক্ষ্য না হয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—প্রবীণদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব কি না, যেখানে তারা পরিবারের সঙ্গে থাকলেও নিরাপদ থাকবেন, আবার প্রয়োজন হলে মানসম্মত বিকল্প আবাসন ও পরিচর্যাও পাবেন।
প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার বিষয়টি শুধু বৃদ্ধাশ্রম বা ভাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রবীণ যখন বাস, মেট্রোরেল বা অন্য কোনো গণপরিবহন ব্যবহার করবেন, তখন তার জন্য সহজ নির্দেশনা, বসার সুযোগ, ছাড় পাওয়ার প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় সহায়তা থাকা দরকার।
হাসপাতালেও প্রবীণ রোগীর জন্য আলাদা সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে ফুটপাত, রাস্তা, সরকারি কার্যালয় ও বিনোদনস্থল—সব জায়গায় প্রবীণদের চলাচলের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা দরকার।
কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমতে পারে, কিন্তু তার নাগরিক অধিকার কমে যায় না।
প্রবীণ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পৃথক বাণীতেও প্রবীণদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে আপনার সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বাণীতে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতার বিষয়টি তুলে ধরে তাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, বয়স্কভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের মূল বার্তাটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আজকের ছোট সমস্যা আগামী দিনে বড় সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।
প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বিনিয়োগ। আজ যারা তরুণ, একদিন তারাও প্রবীণ হবেন। তাই প্রশ্নটি শুধু ‘প্রবীণদের কী দেওয়া হবে’—এভাবে দেখলে হবে না; বরং ‘আমরা কেমন সমাজে নিজের বার্ধক্য কাটাতে চাই’—সেই প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।
ভাতা দরকার, কিন্তু তার পাশাপাশি প্রয়োজন সাশ্রয়ী চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ আবাসন, সহজ গণপরিবহন, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সবচেয়ে বড় কথা—পরিবার ও সমাজে সম্মানের জায়গা। দীর্ঘায়ু তখনই অর্থবহ হবে, যখন দীর্ঘ জীবন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণও হবে।

আপনার মতামত লিখুন