একটি শিশু অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ট্রেনে উঠে চলে গেল অচেনা শহরে। ভাগ্য ভালো হলে কোনো পথচারী তাকে একা দেখে শিশু সহায়তা হেল্পলাইনে খবর দেন, পুলিশ তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু সব শিশুর গল্প অনিকের মতো সহজ সমাপ্তি পায় না।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি)-র তথ্য পেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। তবে এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর।
এই সংখ্যা শুধু নিখোঁজের পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের উদ্বেগ, অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এই শিশুরা কোথায় যাচ্ছে, কেন হারিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাই বা কতটা কার্যকর?
পুলিশের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ৬৮ জনের।
অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের ঘটনা অনেক বেশি। এ বয়সি শিশুদের নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি ১ হাজার ৯৭০ জনের।
অর্থাৎ নিখোঁজ শিশুদের বড় অংশই কিশোর বয়সি। এই বয়সে পারিবারিক সম্পর্ক, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের প্রভাব এবং স্বাধীনভাবে চলার আকাঙ্ক্ষা অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, হারিয়ে যাওয়া শিশুদের একটি বড় অংশ ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। তাদের কেউ কেউ বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে যায়। পুলিশ শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত উদ্ধারের চেষ্টা করে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, শাস্তির ভয়, আর্থিক সংকট, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা কিংবা পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা—বিভিন্ন কারণে শিশুরা বাড়ি ছাড়তে পারে।
শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহাইমেন জানান, পরিবারে শাস্তি, বাবা-মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে, ঝগড়া ও অভাবের মতো কারণেও শিশু নিখোঁজের জিডি হয়। মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে পাচার, গৃহশ্রমিক হিসেবে নির্যাতন, অপহরণসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কথাও উঠে আসে।
পুলিশের তথ্য থেকেই বোঝা যায়, নিখোঁজ হওয়া সব শিশুর ক্ষেত্রে একই ধরনের কারণ বা গন্তব্য নেই। কেউ পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে নিজেই চলে যায়, আবার কেউ অপরাধী চক্রের শিকার হতে পারে।
ঢাকার কমলাপুরে মেয়েদের সরকারি পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে বর্তমানে বিভিন্ন বয়সি কন্যাশিশু রয়েছে। কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের মতে, তাদের অনেকেরই পরিবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে উদ্ধার হওয়ার পরও শিশুকে শুধু পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সবসময় সমস্যার শেষ সমাধান হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. রেজাউল করিম সোহাগের মতে, অনেক শিশু অপহরণের শিকার হয়। এক শ্রেণির মানুষ এসব শিশুকে ভিক্ষা কিংবা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের অপরাধের জগতেও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টি হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২২ হাজার ৫৫০টিতে দাঁড়ায়।
পুলিশের মতে, অনলাইন জিডি চালু হওয়ায় নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগ করা সহজ হয়েছে। ফলে জিডির সংখ্যাও বেড়েছে। তাই শুধু মোট নিখোঁজের সংখ্যা দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। কতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ—দুটি তথ্যই পাশাপাশি দেখা জরুরি।
তবে এখনো নিখোঁজ থাকা ২ হাজার ৩৮ শিশুর বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। প্রতিটি শিশুর অবস্থান শনাক্ত করা এবং তারা কোনো অপরাধী চক্রের হাতে পড়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি।
একটি শিশু নিখোঁজ হলে শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজেরই দায়িত্ব তৈরি হয়। দ্রুত জিডি করা, শিশুর ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া এবং সন্দেহজনক কোনো তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। শুধু শাসন নয়, তাদের কথা শোনা এবং সমস্যার কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা গেলে অনেক শিশুর বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা দিয়ে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। উদ্ধারের পর শিশুর কী হচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু অপহরণ বা পাচারের শিকার হলে তাকে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মানসিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।
সাইবার যোগাযোগের বিস্তারও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘদিন নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কমানো কঠিন হবে।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একটি শিশু অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ট্রেনে উঠে চলে গেল অচেনা শহরে। ভাগ্য ভালো হলে কোনো পথচারী তাকে একা দেখে শিশু সহায়তা হেল্পলাইনে খবর দেন, পুলিশ তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু সব শিশুর গল্প অনিকের মতো সহজ সমাপ্তি পায় না।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি)-র তথ্য পেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। তবে এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর।
এই সংখ্যা শুধু নিখোঁজের পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের উদ্বেগ, অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এই শিশুরা কোথায় যাচ্ছে, কেন হারিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাই বা কতটা কার্যকর?
পুলিশের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ৬৮ জনের।
অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের ঘটনা অনেক বেশি। এ বয়সি শিশুদের নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি ১ হাজার ৯৭০ জনের।
অর্থাৎ নিখোঁজ শিশুদের বড় অংশই কিশোর বয়সি। এই বয়সে পারিবারিক সম্পর্ক, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের প্রভাব এবং স্বাধীনভাবে চলার আকাঙ্ক্ষা অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, হারিয়ে যাওয়া শিশুদের একটি বড় অংশ ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। তাদের কেউ কেউ বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে যায়। পুলিশ শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত উদ্ধারের চেষ্টা করে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, শাস্তির ভয়, আর্থিক সংকট, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা কিংবা পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা—বিভিন্ন কারণে শিশুরা বাড়ি ছাড়তে পারে।
শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহাইমেন জানান, পরিবারে শাস্তি, বাবা-মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে, ঝগড়া ও অভাবের মতো কারণেও শিশু নিখোঁজের জিডি হয়। মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে পাচার, গৃহশ্রমিক হিসেবে নির্যাতন, অপহরণসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কথাও উঠে আসে।
পুলিশের তথ্য থেকেই বোঝা যায়, নিখোঁজ হওয়া সব শিশুর ক্ষেত্রে একই ধরনের কারণ বা গন্তব্য নেই। কেউ পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে নিজেই চলে যায়, আবার কেউ অপরাধী চক্রের শিকার হতে পারে।
ঢাকার কমলাপুরে মেয়েদের সরকারি পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে বর্তমানে বিভিন্ন বয়সি কন্যাশিশু রয়েছে। কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের মতে, তাদের অনেকেরই পরিবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে উদ্ধার হওয়ার পরও শিশুকে শুধু পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সবসময় সমস্যার শেষ সমাধান হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. রেজাউল করিম সোহাগের মতে, অনেক শিশু অপহরণের শিকার হয়। এক শ্রেণির মানুষ এসব শিশুকে ভিক্ষা কিংবা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের অপরাধের জগতেও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টি হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২২ হাজার ৫৫০টিতে দাঁড়ায়।
পুলিশের মতে, অনলাইন জিডি চালু হওয়ায় নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগ করা সহজ হয়েছে। ফলে জিডির সংখ্যাও বেড়েছে। তাই শুধু মোট নিখোঁজের সংখ্যা দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। কতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ—দুটি তথ্যই পাশাপাশি দেখা জরুরি।
তবে এখনো নিখোঁজ থাকা ২ হাজার ৩৮ শিশুর বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। প্রতিটি শিশুর অবস্থান শনাক্ত করা এবং তারা কোনো অপরাধী চক্রের হাতে পড়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি।
একটি শিশু নিখোঁজ হলে শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজেরই দায়িত্ব তৈরি হয়। দ্রুত জিডি করা, শিশুর ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া এবং সন্দেহজনক কোনো তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। শুধু শাসন নয়, তাদের কথা শোনা এবং সমস্যার কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা গেলে অনেক শিশুর বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা দিয়ে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। উদ্ধারের পর শিশুর কী হচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু অপহরণ বা পাচারের শিকার হলে তাকে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মানসিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।
সাইবার যোগাযোগের বিস্তারও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘদিন নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কমানো কঠিন হবে।

আপনার মতামত লিখুন