ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পরিবারের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন আনিছুর রহমান। মোটরসাইকেলের সামনে বসেছিল চার বছরের মেয়ে আয়শা। পেছনে ছিলেন স্ত্রী পুষ্পা আক্তার। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু বদলে যায়। বগুড়া শহরের বনানী মোড়ে পেছন থেকে আসা একটি ট্রাকের ধাক্কায় সড়কেই নিভে যায় বাবা-মেয়ের জীবন।
সোমবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আনিছুর রহমানের স্ত্রী পুষ্পা আক্তার। তাঁকে গুরুতর অবস্থায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত আনিছুর রহমান (৩৫) পাবনা জেলার সুজানগর থানার গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে ক্রেডিট অফিসার হিসেবে বগুড়ায় কর্মরত ছিলেন। নিহত শিশু আয়শা খাতুন ছিল তাঁদের একমাত্র মেয়ে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, কোরবানি ঈদ উপলক্ষে কয়েক দিনের ছুটি পেয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন আনিছুর রহমান। সকালে শহরের ব্যস্ত বনানী মোড় অতিক্রম করার সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি ট্রাক তাঁদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কার তীব্রতায় মোটরসাইকেলটি সড়কে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই আনিছুর রহমান ও তাঁর মেয়ে আয়শা মারা যান। গুরুতর আহত হন পুষ্পা আক্তার।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় মানুষ ছুটে এসে আহত নারীকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ এসে তাঁকে হাসপাতালে পাঠায়। এ সময় সড়কের একাংশে যান চলাচলও কিছু সময়ের জন্য ধীর হয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত ট্রাকটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল বলেন, দুর্ঘটনার আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ট্রাকটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিকভাবে এটি দ্রুতগতির কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ট্রাকচালকের গাফিলতির অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হাসপাতালে নেওয়ার পর আহত পুষ্পা আক্তারের অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। স্বজনেরা হাসপাতালে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঈদকে ঘিরে কয়েক দিন ধরেই আনন্দের প্রস্তুতি চলছিল তাঁদের বাড়িতে। ছোট্ট আয়শার জন্য নতুন পোশাকও কেনা হয়েছিল।
এক আত্মীয় বলেন, “সকালে ফোনে বলেছিল রওনা দিয়েছে। ঘণ্টাখানেক পর শুনি দুর্ঘটনা হয়েছে। বিশ্বাসই করতে পারছি না।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, বনানী মোড় এলাকায় প্রায়ই দ্রুতগতির যানবাহন বেপরোয়া চলাচল করে। বিশেষ করে ঈদের সময় যানবাহনের চাপ বাড়লে ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
দেশের সড়কগুলোতে উৎসবের আগে-পরে দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদকে ঘিরে বাড়ি ফেরার তাড়াহুড়ো, অতিরিক্ত যানচাপ, ক্লান্ত চালক এবং গতিনিয়ন্ত্রণ না মানার প্রবণতা বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেলে পরিবারের একাধিক সদস্য যাতায়াত করেন। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের ঘাটতিও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়। আবার ট্রাক ও ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, শুধু আইন করলেই হবে না, বাস্তবে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়ক ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নজরদারি বাড়ানো, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানচালনার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
যে পরিবারটি কয়েক ঘণ্টা পর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে ঈদের আনন্দে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, সেই পরিবার এখন শোকের ভারে বিধ্বস্ত। ছোট্ট আয়শার মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেককে নাড়া দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—সড়কে মানুষের জীবন কি এতটাই অনিরাপদ হয়ে গেছে?
এই দুর্ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে সড়ক নিরাপত্তার পুরোনো সংকট। প্রতিদিনের মতো আরেকটি খবর হিসেবেই যদি এমন মৃত্যু থেকে যায়,
তাহলে হয়তো আরও অনেক পরিবার একইভাবে স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ট্রাকটি শনাক্ত করে চালকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নিহত আনিছুর রহমান ও তাঁর ছোট্ট মেয়ের জন্য সেই বিচার আর জীবনের ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না—এ কথাই বলছেন স্থানীয়রা।

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পরিবারের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন আনিছুর রহমান। মোটরসাইকেলের সামনে বসেছিল চার বছরের মেয়ে আয়শা। পেছনে ছিলেন স্ত্রী পুষ্পা আক্তার। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু বদলে যায়। বগুড়া শহরের বনানী মোড়ে পেছন থেকে আসা একটি ট্রাকের ধাক্কায় সড়কেই নিভে যায় বাবা-মেয়ের জীবন।
সোমবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আনিছুর রহমানের স্ত্রী পুষ্পা আক্তার। তাঁকে গুরুতর অবস্থায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত আনিছুর রহমান (৩৫) পাবনা জেলার সুজানগর থানার গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে ক্রেডিট অফিসার হিসেবে বগুড়ায় কর্মরত ছিলেন। নিহত শিশু আয়শা খাতুন ছিল তাঁদের একমাত্র মেয়ে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, কোরবানি ঈদ উপলক্ষে কয়েক দিনের ছুটি পেয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন আনিছুর রহমান। সকালে শহরের ব্যস্ত বনানী মোড় অতিক্রম করার সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি ট্রাক তাঁদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কার তীব্রতায় মোটরসাইকেলটি সড়কে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই আনিছুর রহমান ও তাঁর মেয়ে আয়শা মারা যান। গুরুতর আহত হন পুষ্পা আক্তার।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় মানুষ ছুটে এসে আহত নারীকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ এসে তাঁকে হাসপাতালে পাঠায়। এ সময় সড়কের একাংশে যান চলাচলও কিছু সময়ের জন্য ধীর হয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত ট্রাকটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল বলেন, দুর্ঘটনার আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ট্রাকটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিকভাবে এটি দ্রুতগতির কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ট্রাকচালকের গাফিলতির অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হাসপাতালে নেওয়ার পর আহত পুষ্পা আক্তারের অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। স্বজনেরা হাসপাতালে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঈদকে ঘিরে কয়েক দিন ধরেই আনন্দের প্রস্তুতি চলছিল তাঁদের বাড়িতে। ছোট্ট আয়শার জন্য নতুন পোশাকও কেনা হয়েছিল।
এক আত্মীয় বলেন, “সকালে ফোনে বলেছিল রওনা দিয়েছে। ঘণ্টাখানেক পর শুনি দুর্ঘটনা হয়েছে। বিশ্বাসই করতে পারছি না।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, বনানী মোড় এলাকায় প্রায়ই দ্রুতগতির যানবাহন বেপরোয়া চলাচল করে। বিশেষ করে ঈদের সময় যানবাহনের চাপ বাড়লে ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
দেশের সড়কগুলোতে উৎসবের আগে-পরে দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদকে ঘিরে বাড়ি ফেরার তাড়াহুড়ো, অতিরিক্ত যানচাপ, ক্লান্ত চালক এবং গতিনিয়ন্ত্রণ না মানার প্রবণতা বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেলে পরিবারের একাধিক সদস্য যাতায়াত করেন। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের ঘাটতিও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়। আবার ট্রাক ও ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, শুধু আইন করলেই হবে না, বাস্তবে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়ক ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নজরদারি বাড়ানো, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানচালনার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
যে পরিবারটি কয়েক ঘণ্টা পর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে ঈদের আনন্দে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, সেই পরিবার এখন শোকের ভারে বিধ্বস্ত। ছোট্ট আয়শার মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেককে নাড়া দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—সড়কে মানুষের জীবন কি এতটাই অনিরাপদ হয়ে গেছে?
এই দুর্ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে সড়ক নিরাপত্তার পুরোনো সংকট। প্রতিদিনের মতো আরেকটি খবর হিসেবেই যদি এমন মৃত্যু থেকে যায়,
তাহলে হয়তো আরও অনেক পরিবার একইভাবে স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ট্রাকটি শনাক্ত করে চালকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নিহত আনিছুর রহমান ও তাঁর ছোট্ট মেয়ের জন্য সেই বিচার আর জীবনের ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না—এ কথাই বলছেন স্থানীয়রা।

আপনার মতামত লিখুন