দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : রোববার, ২৪ মে ২০২৬

বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬ ঘোষণা, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উন্মুক্ত ২৬ ব্লক

বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬ ঘোষণা, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উন্মুক্ত ২৬ ব্লক

অস্ট্রেলিয়ায় চার দিনের কর্মসপ্তাহে মিলল ইতিবাচক ফল, উৎপাদনশীলতা কমেনি কোনো প্রতিষ্ঠানে

মেহেরপুরে ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণ মামলায় শাকিল হোসেনের ফাঁসির রায়

সাত দিনের মধ্যে রামিসা হত্যা মামলার বিচার শেষের আশ্বাস, ধর্ষণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

কক্সবাজার আদালত চত্বরে গুলি, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাসহ আহত ৩

শেরপুরে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ, গণপিটুনির পর বাড়ির মালিকের ছেলে পুলিশের হেফাজতে

ফরিদপুরে বিআরটিসি বাস-অ্যাম্বুলেন্স সংঘর্ষে নিহত ৫, মহাসড়কে হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা

হোয়াইট হাউসের কাছে ফের গুলি, পাল্টা গুলিতে নিহত বন্দুকধারী

বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬ ঘোষণা, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উন্মুক্ত ২৬ ব্লক

বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬ ঘোষণা, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উন্মুক্ত ২৬ ব্লক
বঙ্গোপসাগরে নতুন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য ২৬টি ব্লক উন্মুক্ত করল সরকার। -ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচিত সরকারের প্রতি আস্থা ফিরছে, আগ্রহ দেখাচ্ছে বিদেশি কোম্পানি

এক দশকেরও বেশি সময় পর আবারও সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বড় উদ্যোগ নিল সরকার। ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ নামে নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। সরকার বলছে, নির্বাচিত সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আস্থা ফেরায় এবার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে।


রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) এবং অফশোর বিডিং রাউন্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। এতে জানানো হয়, ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা গেছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা ও নীতিগত নিশ্চয়তা দেখতে চায়, সেটি এখন তারা পাচ্ছে।”

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই অফশোর বিডিং রাউন্ড?

বাংলাদেশের স্থলভাগের বেশিরভাগ গ্যাসক্ষেত্র ধীরে ধীরে চাপ হারাচ্ছে। নতুন গ্যাসের বড় উৎস খুঁজে না পেলে আগামী কয়েক বছরে জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। সেই প্রেক্ষাপটে সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানকে নতুন আশার জায়গা হিসেবে দেখছে সরকার।

মন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই ১০০ দিনের মধ্যে অফশোর বিডিং রাউন্ড আয়োজনের নির্দেশনা ছিল।

সরকারের দাবি, নতুন ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)-২০২৬’ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আগের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করা হয়েছে। কারণ অতীতে কঠিন কিছু শর্তের কারণে অনেক বড় কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে যায়নি।

নতুন পিএসসিতে কী কী সুবিধা থাকছে?

বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে নতুন মডেল পিএসসিতে বেশ কিছু বড় ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ১০০ শতাংশ কস্ট রিকভারি সুবিধা
  • ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য সমন্বয়
  • কন্ট্রাক্টরের আয়কর পেট্রোবাংলা বহন করবে
  • আমদানিকৃত যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড়
  • নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ
  • গভীর সমুদ্রে পাশাপাশি দুটি ব্লকের জন্য একক চুক্তির সুবিধা

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই পরিবর্তনগুলো জরুরি ছিল। কারণ ভারত, মিয়ানমার কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও সমুদ্রের ব্লক বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করছে এবং সেখানে নানা আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।


তবে সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, অতিরিক্ত সুবিধা দিলে ভবিষ্যতে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। যদিও সরকার বলছে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী চুক্তি করা হয়েছে।

গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ?

গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি প্রকল্পগুলোর একটি। জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, একটি প্রকল্পে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। অথচ অনুসন্ধান শেষে গ্যাস বা তেল না পাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

তিনি স্পষ্ট করে জানান, কোনো কোম্পানি অনুসন্ধানে ব্যর্থ হলে সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে না। বরং শর্ত ভঙ্গ হলে ব্যাংক গ্যারান্টিও বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়নি। সমুদ্রের গভীর এলাকায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় বাংলাদেশ একা এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এজন্য বিদেশি অভিজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা কী বলছে?

সংবাদ সম্মেলনে অতীতের সফল অফশোর বিডিং রাউন্ডের কথাও তুলে ধরা হয়। মন্ত্রী জানান, ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে দেশের প্রথম সফল আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় একাধিক আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয় এবং পরে বিবিয়ানা ও সাঙ্গুর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়।

বর্তমানে দেশের গ্যাস উৎপাদনের বড় একটি অংশ সেই সময়কার বিদেশি বিনিয়োগের ফল বলেও দাবি করেন তিনি।

সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় ৫৫ শতাংশ বিদেশি কোম্পানি পরিচালিত ক্ষেত্র থেকে আসছে। এ কারণেই নতুন বিডিং রাউন্ড নিয়েও সরকার আশাবাদী।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কি বিনিয়োগ টানছে?

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় একটি বিষয়। সরকার যেহেতু নির্বাচিত সরকারের বৈধতা ও ধারাবাহিকতার বিষয়টি জোর দিয়ে বলছে, তাই সেটিকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আস্থার বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

তবে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিরতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বড় একটি প্রশ্ন হচ্ছে—এত বড় বিনিয়োগ ও নতুন চুক্তির সুফল শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দাম কমাতে বা বিদ্যুৎ সংকট কমাতে কতটা কাজে আসবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অফশোর অনুসন্ধান শুরু হলেও বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হতে অন্তত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। তাই এটি তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি।

সামনে কী হতে পারে?

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যদি আন্তর্জাতিক বড় কোম্পানিগুলো এই বিডিং রাউন্ডে অংশ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বৈশ্বিক জ্বালানি মানচিত্রে গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য গ্যাস মজুদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ রয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর।

তবে বাস্তবে কতগুলো কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত কয়টি ব্লকে অনুসন্ধান কাজ শুরু হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কারণ অতীতেও কিছু দরপত্রে প্রত্যাশার তুলনায় কম সাড়া মিলেছিল। এবার সরকার আস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নতুন আর্থিক সুবিধার সমন্বয়ে সেই চিত্র বদলানোর আশা করছে।

বিষয় : বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান, বাংলাদেশ তেল গ্যাস খবর, বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশ, পিএসসি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

রোববার, ২৪ মে ২০২৬


বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬ ঘোষণা, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উন্মুক্ত ২৬ ব্লক

প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

featured Image

নির্বাচিত সরকারের প্রতি আস্থা ফিরছে, আগ্রহ দেখাচ্ছে বিদেশি কোম্পানি

এক দশকেরও বেশি সময় পর আবারও সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বড় উদ্যোগ নিল সরকার। ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ নামে নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। সরকার বলছে, নির্বাচিত সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আস্থা ফেরায় এবার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে।


রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) এবং অফশোর বিডিং রাউন্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। এতে জানানো হয়, ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা গেছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা ও নীতিগত নিশ্চয়তা দেখতে চায়, সেটি এখন তারা পাচ্ছে।”

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই অফশোর বিডিং রাউন্ড?

বাংলাদেশের স্থলভাগের বেশিরভাগ গ্যাসক্ষেত্র ধীরে ধীরে চাপ হারাচ্ছে। নতুন গ্যাসের বড় উৎস খুঁজে না পেলে আগামী কয়েক বছরে জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। সেই প্রেক্ষাপটে সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানকে নতুন আশার জায়গা হিসেবে দেখছে সরকার।

মন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই ১০০ দিনের মধ্যে অফশোর বিডিং রাউন্ড আয়োজনের নির্দেশনা ছিল।

সরকারের দাবি, নতুন ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)-২০২৬’ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আগের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করা হয়েছে। কারণ অতীতে কঠিন কিছু শর্তের কারণে অনেক বড় কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে যায়নি।

নতুন পিএসসিতে কী কী সুবিধা থাকছে?

বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে নতুন মডেল পিএসসিতে বেশ কিছু বড় ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ১০০ শতাংশ কস্ট রিকভারি সুবিধা
  • ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য সমন্বয়
  • কন্ট্রাক্টরের আয়কর পেট্রোবাংলা বহন করবে
  • আমদানিকৃত যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড়
  • নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ
  • গভীর সমুদ্রে পাশাপাশি দুটি ব্লকের জন্য একক চুক্তির সুবিধা

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই পরিবর্তনগুলো জরুরি ছিল। কারণ ভারত, মিয়ানমার কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও সমুদ্রের ব্লক বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করছে এবং সেখানে নানা আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।


তবে সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, অতিরিক্ত সুবিধা দিলে ভবিষ্যতে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। যদিও সরকার বলছে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী চুক্তি করা হয়েছে।

গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ?

গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি প্রকল্পগুলোর একটি। জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, একটি প্রকল্পে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। অথচ অনুসন্ধান শেষে গ্যাস বা তেল না পাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

তিনি স্পষ্ট করে জানান, কোনো কোম্পানি অনুসন্ধানে ব্যর্থ হলে সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে না। বরং শর্ত ভঙ্গ হলে ব্যাংক গ্যারান্টিও বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়নি। সমুদ্রের গভীর এলাকায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় বাংলাদেশ একা এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এজন্য বিদেশি অভিজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা কী বলছে?

সংবাদ সম্মেলনে অতীতের সফল অফশোর বিডিং রাউন্ডের কথাও তুলে ধরা হয়। মন্ত্রী জানান, ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে দেশের প্রথম সফল আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় একাধিক আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয় এবং পরে বিবিয়ানা ও সাঙ্গুর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়।

বর্তমানে দেশের গ্যাস উৎপাদনের বড় একটি অংশ সেই সময়কার বিদেশি বিনিয়োগের ফল বলেও দাবি করেন তিনি।

সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় ৫৫ শতাংশ বিদেশি কোম্পানি পরিচালিত ক্ষেত্র থেকে আসছে। এ কারণেই নতুন বিডিং রাউন্ড নিয়েও সরকার আশাবাদী।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কি বিনিয়োগ টানছে?

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় একটি বিষয়। সরকার যেহেতু নির্বাচিত সরকারের বৈধতা ও ধারাবাহিকতার বিষয়টি জোর দিয়ে বলছে, তাই সেটিকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আস্থার বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

তবে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিরতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বড় একটি প্রশ্ন হচ্ছে—এত বড় বিনিয়োগ ও নতুন চুক্তির সুফল শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দাম কমাতে বা বিদ্যুৎ সংকট কমাতে কতটা কাজে আসবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অফশোর অনুসন্ধান শুরু হলেও বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হতে অন্তত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। তাই এটি তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি।

সামনে কী হতে পারে?

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যদি আন্তর্জাতিক বড় কোম্পানিগুলো এই বিডিং রাউন্ডে অংশ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বৈশ্বিক জ্বালানি মানচিত্রে গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য গ্যাস মজুদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ রয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর।

তবে বাস্তবে কতগুলো কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত কয়টি ব্লকে অনুসন্ধান কাজ শুরু হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কারণ অতীতেও কিছু দরপত্রে প্রত্যাশার তুলনায় কম সাড়া মিলেছিল। এবার সরকার আস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নতুন আর্থিক সুবিধার সমন্বয়ে সেই চিত্র বদলানোর আশা করছে।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর