ঢাকার ব্যস্ত শহরজীবনের মাঝেই হঠাৎ এক ভিন্ন দৃশ্য। সকালবেলা রমনা পার্ক থেকে শুরু হয়ে মানুষের দীর্ঘ পদযাত্রা, গন্তব্য মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন। আর টিএসসি প্রাঙ্গণে সাজানো ১০০টি ছবি—বাংলাদেশের এমন সব জীববৈচিত্র্য, যা অনেকেই চোখেই দেখেনি। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসে ঢাকায় তৈরি হলো এক ভিন্ন আবহ।
আয়োজকদের দাবি, প্রকৃতিকে বাঁচাতে এখনই মানুষকে সচেতন করা জরুরি—নাহলে দেশের অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ হারিয়ে যাবে ইতিহাস থেকে।
শুক্রবার সকালে রমনা পার্ক থেকে শুরু হয় ‘ওয়াক ফর বায়োডাইভারসিটি’ নামের পদযাত্রা। অংশ নেন পরিবেশকর্মী, তরুণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা। ধাপে ধাপে তারা এগিয়ে যান মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (বোটানিক্যাল গার্ডেন) পর্যন্ত।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই পদযাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—বাংলাদেশের প্রকৃতি এখন নানা চাপে বিপর্যস্ত।
পদযাত্রায় অংশ নেওয়া অনেকেই জানান, শহরের দূষণ, গাছ কাটা এবং বন্যপ্রাণী হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তারা আগে থেকে সচেতন থাকলেও এমন মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ তাদের আরও ভাবিয়েছে।
বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সঞ্জীব চৌধুরী চত্বরে বসে ‘বাংলাদেশের অদেখা জীববৈচিত্র্য’ শীর্ষক উন্মুক্ত আলোকচিত্র প্রদর্শনী।
চারজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারের তোলা প্রায় ১০০টি ছবি প্রদর্শিত হয় সেখানে। ছবিগুলোতে উঠে আসে সুন্দরবনের বিরল প্রাণী, পাহাড়ি অঞ্চলের পাখি, জলাভূমির জীববৈচিত্র্য এবং নানা ধরনের উদ্ভিদ।
অনেক দর্শনার্থী জানান, বাংলাদেশের প্রকৃতি সম্পর্কে এত কাছ থেকে দেখা সুযোগ তাদের আগে হয়নি। কেউ কেউ বলেন, “একই দেশে থেকেও কত কিছু আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা শুধু তাপমাত্রার পরিবর্তন নয়, এর পেছনে বড় কারণ জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়।
তার ভাষায়, “যত্রতত্র গাছ কাটা, বন্যপ্রাণী শিকার আর প্রকৃতিকে অবহেলা করা আমাদের বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, এমন উদ্যোগ মানুষকে প্রকৃতির প্রতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা।
বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাসফিকুল হাসান টনি জানান, তাদের লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ববোধ তৈরি করা।
তার মতে, “কিছু অসচেতন কর্মকাণ্ড পুরো দেশের জীববৈচিত্র্যকে ঝুঁকিতে ফেলছে। তাই এখনই মানুষকে জাগাতে হবে।”
তিনি আরও জানান, সংগঠনটি ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চায়।
সহ-আয়োজক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ও এই উদ্যোগে যুক্ত থেকে পরিবেশ সুরক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন, বন উজাড়, নদী দখল এবং অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে।
ঢাকা শহরের উদাহরণই সবচেয়ে স্পষ্ট—একসময় যেসব এলাকায় পাখির ডাক শোনা যেত, এখন সেখানে কংক্রিটের দেয়াল আর যানজট।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে দেখা যায়, মানুষ প্রকৃতির থেকে দূরে সরে গেলে পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে ক্ষতি ধীরে ধীরে বাড়লেও সেটি অনেক সময় দেরিতে উপলব্ধি হয়।
এমন পদযাত্রা ও প্রদর্শনীর মতো উদ্যোগ মানুষের মধ্যে “ভিজ্যুয়াল ইমপ্যাক্ট” তৈরি করে, যা লিখিত তথ্যের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দেন—শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন বাস্তব নীতিগত পরিবর্তন, আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
ঢাকার ব্যস্ত শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন শতাধিক মানুষ প্রকৃতি বাঁচানোর কথা বলে, তখন তা শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকে না—এটি হয়ে ওঠে একটি বার্তা। যে বার্তা বলছে, “প্রকৃতি হারালে ভবিষ্যৎও হারাবে।”

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
ঢাকার ব্যস্ত শহরজীবনের মাঝেই হঠাৎ এক ভিন্ন দৃশ্য। সকালবেলা রমনা পার্ক থেকে শুরু হয়ে মানুষের দীর্ঘ পদযাত্রা, গন্তব্য মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন। আর টিএসসি প্রাঙ্গণে সাজানো ১০০টি ছবি—বাংলাদেশের এমন সব জীববৈচিত্র্য, যা অনেকেই চোখেই দেখেনি। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসে ঢাকায় তৈরি হলো এক ভিন্ন আবহ।
আয়োজকদের দাবি, প্রকৃতিকে বাঁচাতে এখনই মানুষকে সচেতন করা জরুরি—নাহলে দেশের অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ হারিয়ে যাবে ইতিহাস থেকে।
শুক্রবার সকালে রমনা পার্ক থেকে শুরু হয় ‘ওয়াক ফর বায়োডাইভারসিটি’ নামের পদযাত্রা। অংশ নেন পরিবেশকর্মী, তরুণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা। ধাপে ধাপে তারা এগিয়ে যান মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (বোটানিক্যাল গার্ডেন) পর্যন্ত।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই পদযাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—বাংলাদেশের প্রকৃতি এখন নানা চাপে বিপর্যস্ত।
পদযাত্রায় অংশ নেওয়া অনেকেই জানান, শহরের দূষণ, গাছ কাটা এবং বন্যপ্রাণী হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তারা আগে থেকে সচেতন থাকলেও এমন মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ তাদের আরও ভাবিয়েছে।
বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সঞ্জীব চৌধুরী চত্বরে বসে ‘বাংলাদেশের অদেখা জীববৈচিত্র্য’ শীর্ষক উন্মুক্ত আলোকচিত্র প্রদর্শনী।
চারজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারের তোলা প্রায় ১০০টি ছবি প্রদর্শিত হয় সেখানে। ছবিগুলোতে উঠে আসে সুন্দরবনের বিরল প্রাণী, পাহাড়ি অঞ্চলের পাখি, জলাভূমির জীববৈচিত্র্য এবং নানা ধরনের উদ্ভিদ।
অনেক দর্শনার্থী জানান, বাংলাদেশের প্রকৃতি সম্পর্কে এত কাছ থেকে দেখা সুযোগ তাদের আগে হয়নি। কেউ কেউ বলেন, “একই দেশে থেকেও কত কিছু আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা শুধু তাপমাত্রার পরিবর্তন নয়, এর পেছনে বড় কারণ জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়।
তার ভাষায়, “যত্রতত্র গাছ কাটা, বন্যপ্রাণী শিকার আর প্রকৃতিকে অবহেলা করা আমাদের বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, এমন উদ্যোগ মানুষকে প্রকৃতির প্রতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা।
বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাসফিকুল হাসান টনি জানান, তাদের লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ববোধ তৈরি করা।
তার মতে, “কিছু অসচেতন কর্মকাণ্ড পুরো দেশের জীববৈচিত্র্যকে ঝুঁকিতে ফেলছে। তাই এখনই মানুষকে জাগাতে হবে।”
তিনি আরও জানান, সংগঠনটি ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চায়।
সহ-আয়োজক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ও এই উদ্যোগে যুক্ত থেকে পরিবেশ সুরক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন, বন উজাড়, নদী দখল এবং অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে।
ঢাকা শহরের উদাহরণই সবচেয়ে স্পষ্ট—একসময় যেসব এলাকায় পাখির ডাক শোনা যেত, এখন সেখানে কংক্রিটের দেয়াল আর যানজট।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে দেখা যায়, মানুষ প্রকৃতির থেকে দূরে সরে গেলে পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে ক্ষতি ধীরে ধীরে বাড়লেও সেটি অনেক সময় দেরিতে উপলব্ধি হয়।
এমন পদযাত্রা ও প্রদর্শনীর মতো উদ্যোগ মানুষের মধ্যে “ভিজ্যুয়াল ইমপ্যাক্ট” তৈরি করে, যা লিখিত তথ্যের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দেন—শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন বাস্তব নীতিগত পরিবর্তন, আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
ঢাকার ব্যস্ত শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন শতাধিক মানুষ প্রকৃতি বাঁচানোর কথা বলে, তখন তা শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকে না—এটি হয়ে ওঠে একটি বার্তা। যে বার্তা বলছে, “প্রকৃতি হারালে ভবিষ্যৎও হারাবে।”

আপনার মতামত লিখুন