দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হঠাৎ করেই পরিণত হলো উত্তপ্ত সংঘর্ষের কেন্দ্রে। দুই আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামলা, পাল্টা উত্তেজনা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩১ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে প্রশাসন। একইসঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সব আবাসিক হল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী শুক্রবার বিকেল ৪টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হঠাৎ এমন ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ আবরার ফাহাদ হলের শতাধিক শিক্ষার্থী দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে শহীদ নূর হোসেন হলে প্রবেশ করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে হলের বিভিন্ন কক্ষ, নামাজঘর, আসবাবপত্র এবং সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে।
ঘটনার সময় হলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত কক্ষ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ আর ভাঙচুরের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আশপাশেও।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানা গেছে। তবে আহতদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ও শৃঙ্খলা বোর্ডের ২৭তম জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বৈঠকের পর শুক্রবার সকালে পৃথক দুটি অফিস আদেশ জারি করা হয়।
রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবু হাসান স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ৩১ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আরও তদন্ত চলবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। প্রশাসনের ভাষ্য, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে কিছু শিক্ষার্থী অভিযোগ তুলেছেন, ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও হলভিত্তিক আধিপত্যের লড়াই কাজ করেছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দেয়নি।
সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সব আবাসিক হল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এই নির্দেশনার বাইরে থাকবেন বলে অফিস আদেশে উল্লেখ রয়েছে।
শুক্রবার দুপুর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী ব্যাগপত্র নিয়ে হল ছাড়তে শুরু করেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কয়েকজনের ঘটনার দায় পুরো শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো হয়েছে। আবার অনেকে মনে করছেন, বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ এলাকায়ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকায় ক্যাম্পাসে এখন থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরে আবাসিক হলকেন্দ্রিক উত্তেজনা, আধিপত্য বিস্তার এবং দলীয় বা গ্রুপভিত্তিক দ্বন্দ্বের ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, দলবদ্ধ মানসিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা অনেক সময় ছোট বিরোধকেও বড় সংঘর্ষে রূপ দেয়।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আবাসিক হলে দীর্ঘসময় একসঙ্গে বসবাসের কারণে ছোট মতবিরোধও দ্রুত ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সংঘাতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, ক্যাম্পাসে নিয়মিত কাউন্সেলিং, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং বিরোধ নিরসনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
সংঘর্ষের পর সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে প্রথম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থী পরিবারকে ফোন করে আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
কিছু শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, তারা কোনো ধরনের সংঘর্ষে জড়িত না থাকলেও হঠাৎ হল বন্ধের সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন বাড়ি ফেরার পরিবহন সংকটেও পড়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কঠোর নজরদারি থাকবে। তদন্ত শেষে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হঠাৎ করেই পরিণত হলো উত্তপ্ত সংঘর্ষের কেন্দ্রে। দুই আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামলা, পাল্টা উত্তেজনা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩১ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে প্রশাসন। একইসঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সব আবাসিক হল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী শুক্রবার বিকেল ৪টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হঠাৎ এমন ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ আবরার ফাহাদ হলের শতাধিক শিক্ষার্থী দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে শহীদ নূর হোসেন হলে প্রবেশ করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে হলের বিভিন্ন কক্ষ, নামাজঘর, আসবাবপত্র এবং সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে।
ঘটনার সময় হলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত কক্ষ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ আর ভাঙচুরের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আশপাশেও।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানা গেছে। তবে আহতদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ও শৃঙ্খলা বোর্ডের ২৭তম জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বৈঠকের পর শুক্রবার সকালে পৃথক দুটি অফিস আদেশ জারি করা হয়।
রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবু হাসান স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ৩১ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আরও তদন্ত চলবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। প্রশাসনের ভাষ্য, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে কিছু শিক্ষার্থী অভিযোগ তুলেছেন, ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও হলভিত্তিক আধিপত্যের লড়াই কাজ করেছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দেয়নি।
সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সব আবাসিক হল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এই নির্দেশনার বাইরে থাকবেন বলে অফিস আদেশে উল্লেখ রয়েছে।
শুক্রবার দুপুর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী ব্যাগপত্র নিয়ে হল ছাড়তে শুরু করেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কয়েকজনের ঘটনার দায় পুরো শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো হয়েছে। আবার অনেকে মনে করছেন, বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ এলাকায়ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকায় ক্যাম্পাসে এখন থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরে আবাসিক হলকেন্দ্রিক উত্তেজনা, আধিপত্য বিস্তার এবং দলীয় বা গ্রুপভিত্তিক দ্বন্দ্বের ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, দলবদ্ধ মানসিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা অনেক সময় ছোট বিরোধকেও বড় সংঘর্ষে রূপ দেয়।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আবাসিক হলে দীর্ঘসময় একসঙ্গে বসবাসের কারণে ছোট মতবিরোধও দ্রুত ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সংঘাতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, ক্যাম্পাসে নিয়মিত কাউন্সেলিং, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং বিরোধ নিরসনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
সংঘর্ষের পর সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে প্রথম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থী পরিবারকে ফোন করে আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
কিছু শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, তারা কোনো ধরনের সংঘর্ষে জড়িত না থাকলেও হঠাৎ হল বন্ধের সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন বাড়ি ফেরার পরিবহন সংকটেও পড়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কঠোর নজরদারি থাকবে। তদন্ত শেষে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন