নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে রেহানা (২০) নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, স্বামী ও শাশুড়ির নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী ও শ্বশুর পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে একটি ছোট শিশুসন্তানকে রেখে এমন মৃত্যু মানবিক প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত রেহানা নওগাঁর বক্তারপুর এলাকার সোহেল রানার মেয়ে। ২০২২ সালের এপ্রিলে মহাদেবপুর উপজেলার সুলতানপুর এলাকার রতনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় মেয়ের পরিবার নগদ এক লাখ টাকা এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দিয়েছিল বলে জানিয়েছে স্বজনরা।
বিয়ের পর থেকেই চাপের অভিযোগ
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই রেহানার ওপর যৌতুকের চাপ বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বেকার স্বামী রতনের ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত তিন লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছিল।
তবে দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে প্রায়ই রেহানাকে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা।
স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশীও জানিয়েছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। অনেক সময় চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দও শুনেছেন তারা। তবে পারিবারিক বিষয় ভেবে কেউ সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি বলে জানিয়েছেন কয়েকজন।
“রাতভর নির্যাতনের” অভিযোগ
স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২২ মে) রাতে আবারও যৌতুকের টাকা নিয়ে রেহানার ওপর চড়াও হন তার স্বামী রতন। এ সময় রতনের মা জহুরা বেগমও নির্যাতনে অংশ নেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে শক্ত বাঁশ দিয়ে রেহানার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। পরিবারের দাবি, এরপরও তার ওপর নির্যাতন চলতে থাকে।
পরে রেহানা নিস্তেজ হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। তবে এর আগেই অভিযুক্তরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তবে ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত পরিবারের কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ছোট্ট সন্তানকে ঘিরে বাড়ছে কান্না
রেহানার মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার তিন বছরের শিশুসন্তান। মায়ের মরদেহ ঘিরে শিশুটির কান্না স্থানীয়দেরও আবেগাপ্লুত করেছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন প্রতিবেশী।
স্থানীয় নারীরা বলছেন, যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি এখনো গ্রামাঞ্চলে ভয়ংকরভাবে টিকে আছে। অনেক নারী নির্যাতন সহ্য করেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কারণ তারা বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে চান না বা পারেন না।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব এবং পারিবারিক আধিপত্যের মানসিকতা অনেক সময় এমন সহিংস ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়। তবে যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও সচেতনতার অভাব ও সামাজিক নীরবতার কারণে অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
পলাতক অভিযুক্তদের খুঁজছে পুলিশ
ঘটনার পর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় থানা পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতা রোধে প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
যৌতুকের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও থামছে না নির্যাতন
বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধে কঠোর আইন থাকলেও বাস্তবে এখনো বহু নারী এই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে বিয়ের পর নতুন করে টাকা দাবি করার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে।
আইনজীবীদের মতে, শুধু মামলা বা গ্রেপ্তার নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন মহল একসঙ্গে কাজ না করলে যৌতুকের মতো অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে রেহানা (২০) নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, স্বামী ও শাশুড়ির নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী ও শ্বশুর পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে একটি ছোট শিশুসন্তানকে রেখে এমন মৃত্যু মানবিক প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত রেহানা নওগাঁর বক্তারপুর এলাকার সোহেল রানার মেয়ে। ২০২২ সালের এপ্রিলে মহাদেবপুর উপজেলার সুলতানপুর এলাকার রতনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় মেয়ের পরিবার নগদ এক লাখ টাকা এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দিয়েছিল বলে জানিয়েছে স্বজনরা।
বিয়ের পর থেকেই চাপের অভিযোগ
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই রেহানার ওপর যৌতুকের চাপ বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বেকার স্বামী রতনের ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত তিন লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছিল।
তবে দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে প্রায়ই রেহানাকে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা।
স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশীও জানিয়েছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। অনেক সময় চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দও শুনেছেন তারা। তবে পারিবারিক বিষয় ভেবে কেউ সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি বলে জানিয়েছেন কয়েকজন।
“রাতভর নির্যাতনের” অভিযোগ
স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২২ মে) রাতে আবারও যৌতুকের টাকা নিয়ে রেহানার ওপর চড়াও হন তার স্বামী রতন। এ সময় রতনের মা জহুরা বেগমও নির্যাতনে অংশ নেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে শক্ত বাঁশ দিয়ে রেহানার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। পরিবারের দাবি, এরপরও তার ওপর নির্যাতন চলতে থাকে।
পরে রেহানা নিস্তেজ হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। তবে এর আগেই অভিযুক্তরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তবে ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত পরিবারের কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ছোট্ট সন্তানকে ঘিরে বাড়ছে কান্না
রেহানার মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার তিন বছরের শিশুসন্তান। মায়ের মরদেহ ঘিরে শিশুটির কান্না স্থানীয়দেরও আবেগাপ্লুত করেছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন প্রতিবেশী।
স্থানীয় নারীরা বলছেন, যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি এখনো গ্রামাঞ্চলে ভয়ংকরভাবে টিকে আছে। অনেক নারী নির্যাতন সহ্য করেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কারণ তারা বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে চান না বা পারেন না।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব এবং পারিবারিক আধিপত্যের মানসিকতা অনেক সময় এমন সহিংস ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়। তবে যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও সচেতনতার অভাব ও সামাজিক নীরবতার কারণে অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
পলাতক অভিযুক্তদের খুঁজছে পুলিশ
ঘটনার পর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় থানা পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতা রোধে প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
যৌতুকের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও থামছে না নির্যাতন
বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধে কঠোর আইন থাকলেও বাস্তবে এখনো বহু নারী এই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে বিয়ের পর নতুন করে টাকা দাবি করার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে।
আইনজীবীদের মতে, শুধু মামলা বা গ্রেপ্তার নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন মহল একসঙ্গে কাজ না করলে যৌতুকের মতো অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।

আপনার মতামত লিখুন