দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : রোববার, ১৭ মে ২০২৬

নদীর মাছেও মিলছে প্লাস্টিক কণা, খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে ঢুকছে নীরব বিষ

নদীর মাছেও মিলছে প্লাস্টিক কণা, খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে ঢুকছে নীরব বিষ

উখিয়ায় বিজিবির দুই অভিযানে বিপুল ইয়াবা উদ্ধার, আটক ১

এক মাসের যুদ্ধে ইরানে প্রাণহানি ৩ হাজার ছাড়াল, বাড়ছে মানবিক সংকট

কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা: নিহত ২১, আহত ৪৫—ধ্বংসস্তূপে চলছে উদ্ধার অভিযান

কলকাতার রাজাবাজারে জুমার নামাজ ঘিরে উত্তেজনা, পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে

লৌহজংয়ে ৮০ পিস ইয়াবাসহ যুবক আটক, মাদকবিরোধী অভিযানে তৎপর পুলিশ

ফরিদপুরে ১১ দিন পর মিলল মা-মেয়ের মরদেহ, কুকুরের টেনে বের করা পা দেখে প্রকাশ্যে আসে হত্যার রহস্য

মণিরামপুরে শুরু হলো বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনছে সরকার

নদীর মাছেও মিলছে প্লাস্টিক কণা, খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে ঢুকছে নীরব বিষ

নদীর মাছেও মিলছে প্লাস্টিক কণা, খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে ঢুকছে নীরব বিষ
ভৈরব ও রূপসা নদীর তীরে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য ও দূষিত পানি। -ছবি: সংগৃহীত

ভৈরব-রূপসার তলদেশে ভয়াবহ দূষণ, গবেষকদের সতর্কবার্তা—ঝুঁকিতে সুন্দরবন ও জনস্বাস্থ্য

প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু নদী বা সমুদ্রের সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে মানুষের খাদ্যচক্রের অংশ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ও বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মাছের শরীর হয়ে মানুষের পেটে পৌঁছাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পরিবেশবিদদের মতে, নদীতে অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ফেলা, শিল্পকারখানার রাসায়নিক নিঃসরণ এবং প্লাস্টিক ব্যবহারের লাগামহীন প্রবণতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। বিশেষ করে সুন্দরবনঘেঁষা নদীগুলোতে এই দূষণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যও বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

গবেষণায় উঠে এলো নদীর তলদেশের ভয়াবহ চিত্র

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক জার্নাল ইমার্জিং কন্টামিন্যান্টস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ভৈরব ও রূপসা নদীর পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্বাভাবিক উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের কয়েকজন গবেষক এই গবেষণা পরিচালনা করেন।


গবেষণার জন্য ভৈরব ও রূপসা নদীর নয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাগুলো নদীর তলদেশের ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গড়ে প্রতি কেজিতে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে প্লাস্টিকের ভাঙা অংশ বা ফ্র্যাগমেন্ট। এছাড়া ফাইবার ও পাতলা ফিল্ম জাতীয় প্লাস্টিকও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ছিল। পলিইথিলিন, পলিস্টাইরিন ও পলিপ্রোপিলিনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমারের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো সাধারণত বাজারের প্যাকেট, বোতল, খাবারের মোড়ক ও গৃহস্থালির প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে তৈরি হয়।

মাছের পেট হয়ে মানুষের শরীরে

গবেষকরা বলছেন, নদীর মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী খাবারের সঙ্গে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে। প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুও মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। পরে সেই মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় চলে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে দীর্ঘদিন জমতে থাকলে তা ফুসফুস, যকৃত, কিডনি ও রক্তনালিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, বুকের দুধ এমনকি মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়ন ভট্টাচার্য দাবি করেন, সুন্দরবন অঞ্চলের খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে ইতোমধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, উপকূলীয় এলাকার মানুষ নিয়মিত নদী ও বনাঞ্চলঘেঁষা মাছ খাওয়ায় তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

কোথা থেকে আসছে এই দূষণ?

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরী, যশোরের নওয়াপাড়া এবং আশপাশের শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নদীতে পড়ছে। বিভিন্ন ড্রেন ও খাল হয়ে নগরীর প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালির বর্জ্য সরাসরি ভৈরব ও রূপসা নদীতে মিশছে।

এছাড়া শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যও নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ট্যানারি ও অন্যান্য কারখানা থেকে আসা বর্জ্যের কারণে নদীর তলদেশে ভারী ধাতুর মাত্রা বাড়ছে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।


জাতিসংঘের ওয়েস্ট ওয়াইজ সিটিস টুলের জরিপ অনুযায়ী, খুলনায় প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর বড় একটি অংশ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় না। বাকি বর্জ্যের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত খাল-নদীতে গিয়ে পড়ে।

পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

সুন্দরবনের দিকেও বাড়ছে হুমকি

ভৈরব ও রূপসা নদীর প্রবাহ সুন্দরবনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় দূষণের প্রভাব বনাঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে প্লাস্টিক কণা ও বিষাক্ত পলি সুন্দরবনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিবেশবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রাম ও বাজার থেকে প্রতিদিন প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, কাপ ও প্লেট নদীতে ফেলা হচ্ছে। পরে সেগুলো ভেসে সুন্দরবনের খাল ও নদীতে জমা হচ্ছে। এতে বনাঞ্চলের প্রাণী ও জলজ জীব মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুজিবুর রহমান বলেন, নদীতে দূষণের মাত্রা ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষ্য, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সুন্দরবনসহ পুরো উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরীও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে মানুষের জীবন ও পরিবেশ—দুটিই বড় সংকটে পড়বে।

নদীর জেলে বলছেন, আগের মতো মাছ নেই

পূর্ব রূপসা এলাকার জেলে জাবেদ হোসেন প্রায় দুই দশক ধরে নদীতে মাছ ধরছেন। তাঁর ভাষ্য, আগের মতো নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। নদীর পানি আগের চেয়ে অনেক খারাপ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, এখন নদীতে জাল ফেললেও অনেক সময় মাছ মেলে না। উল্টো নদীর পানিতে প্লাস্টিকের বোতল ও নানা আবর্জনা ভাসতে দেখা যায়। তাঁর মতে, নদীর এই পরিবর্তন সরাসরি জেলেদের জীবন-জীবিকায় প্রভাব ফেলছে।

সামাজিক প্রভাব: নীরব সংকটের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। নদী ও সমুদ্রের মাছ বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম প্রধান প্রোটিনের উৎস। সেই মাছ যদি ধীরে ধীরে বিষাক্ত কণার বাহক হয়ে ওঠে, তাহলে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া নদীনির্ভর জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।

কীভাবে কিছুটা ঝুঁকি কমানো যেতে পারে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ রান্নার আগে পেট ও নাড়িভুঁড়ি ভালোভাবে ফেলে দেওয়া উচিত। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় অংশ মাছের অন্ত্রে জমা থাকে। মাছ পরিষ্কার করার সময় প্রবাহিত পানিতে ধোয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।


এ ছাড়া দূষিত নদীর বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছ বা তুলনামূলক নিরাপদ উৎসের মাছ বেছে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব।

এখন কী করা জরুরি

পরিবেশবিদদের দাবি, নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধন বাধ্যতামূলক করা, নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা এবং প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

তাদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে নদী, সুন্দরবন ও মানুষের স্বাস্থ্য—সবকিছুই আরও বড় বিপদের দিকে এগোবে।

বিষয় : মাছে প্লাস্টিক কণা সুন্দরবন পরিবেশ সংকট ভৈরব নদ দূষণ,

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

রোববার, ১৭ মে ২০২৬


নদীর মাছেও মিলছে প্লাস্টিক কণা, খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে ঢুকছে নীরব বিষ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image

ভৈরব-রূপসার তলদেশে ভয়াবহ দূষণ, গবেষকদের সতর্কবার্তা—ঝুঁকিতে সুন্দরবন ও জনস্বাস্থ্য

প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু নদী বা সমুদ্রের সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে মানুষের খাদ্যচক্রের অংশ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ও বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মাছের শরীর হয়ে মানুষের পেটে পৌঁছাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পরিবেশবিদদের মতে, নদীতে অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ফেলা, শিল্পকারখানার রাসায়নিক নিঃসরণ এবং প্লাস্টিক ব্যবহারের লাগামহীন প্রবণতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। বিশেষ করে সুন্দরবনঘেঁষা নদীগুলোতে এই দূষণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যও বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

গবেষণায় উঠে এলো নদীর তলদেশের ভয়াবহ চিত্র

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক জার্নাল ইমার্জিং কন্টামিন্যান্টস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ভৈরব ও রূপসা নদীর পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্বাভাবিক উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের কয়েকজন গবেষক এই গবেষণা পরিচালনা করেন।


গবেষণার জন্য ভৈরব ও রূপসা নদীর নয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাগুলো নদীর তলদেশের ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গড়ে প্রতি কেজিতে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে প্লাস্টিকের ভাঙা অংশ বা ফ্র্যাগমেন্ট। এছাড়া ফাইবার ও পাতলা ফিল্ম জাতীয় প্লাস্টিকও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ছিল। পলিইথিলিন, পলিস্টাইরিন ও পলিপ্রোপিলিনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমারের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো সাধারণত বাজারের প্যাকেট, বোতল, খাবারের মোড়ক ও গৃহস্থালির প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে তৈরি হয়।

মাছের পেট হয়ে মানুষের শরীরে

গবেষকরা বলছেন, নদীর মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী খাবারের সঙ্গে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে। প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুও মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। পরে সেই মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় চলে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে দীর্ঘদিন জমতে থাকলে তা ফুসফুস, যকৃত, কিডনি ও রক্তনালিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, বুকের দুধ এমনকি মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়ন ভট্টাচার্য দাবি করেন, সুন্দরবন অঞ্চলের খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে ইতোমধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, উপকূলীয় এলাকার মানুষ নিয়মিত নদী ও বনাঞ্চলঘেঁষা মাছ খাওয়ায় তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

কোথা থেকে আসছে এই দূষণ?

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরী, যশোরের নওয়াপাড়া এবং আশপাশের শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নদীতে পড়ছে। বিভিন্ন ড্রেন ও খাল হয়ে নগরীর প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালির বর্জ্য সরাসরি ভৈরব ও রূপসা নদীতে মিশছে।

এছাড়া শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যও নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ট্যানারি ও অন্যান্য কারখানা থেকে আসা বর্জ্যের কারণে নদীর তলদেশে ভারী ধাতুর মাত্রা বাড়ছে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।


জাতিসংঘের ওয়েস্ট ওয়াইজ সিটিস টুলের জরিপ অনুযায়ী, খুলনায় প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর বড় একটি অংশ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় না। বাকি বর্জ্যের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত খাল-নদীতে গিয়ে পড়ে।

পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

সুন্দরবনের দিকেও বাড়ছে হুমকি

ভৈরব ও রূপসা নদীর প্রবাহ সুন্দরবনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় দূষণের প্রভাব বনাঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে প্লাস্টিক কণা ও বিষাক্ত পলি সুন্দরবনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিবেশবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রাম ও বাজার থেকে প্রতিদিন প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, কাপ ও প্লেট নদীতে ফেলা হচ্ছে। পরে সেগুলো ভেসে সুন্দরবনের খাল ও নদীতে জমা হচ্ছে। এতে বনাঞ্চলের প্রাণী ও জলজ জীব মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুজিবুর রহমান বলেন, নদীতে দূষণের মাত্রা ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষ্য, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সুন্দরবনসহ পুরো উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরীও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে মানুষের জীবন ও পরিবেশ—দুটিই বড় সংকটে পড়বে।

নদীর জেলে বলছেন, আগের মতো মাছ নেই

পূর্ব রূপসা এলাকার জেলে জাবেদ হোসেন প্রায় দুই দশক ধরে নদীতে মাছ ধরছেন। তাঁর ভাষ্য, আগের মতো নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। নদীর পানি আগের চেয়ে অনেক খারাপ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, এখন নদীতে জাল ফেললেও অনেক সময় মাছ মেলে না। উল্টো নদীর পানিতে প্লাস্টিকের বোতল ও নানা আবর্জনা ভাসতে দেখা যায়। তাঁর মতে, নদীর এই পরিবর্তন সরাসরি জেলেদের জীবন-জীবিকায় প্রভাব ফেলছে।

সামাজিক প্রভাব: নীরব সংকটের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। নদী ও সমুদ্রের মাছ বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম প্রধান প্রোটিনের উৎস। সেই মাছ যদি ধীরে ধীরে বিষাক্ত কণার বাহক হয়ে ওঠে, তাহলে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া নদীনির্ভর জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।

কীভাবে কিছুটা ঝুঁকি কমানো যেতে পারে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ রান্নার আগে পেট ও নাড়িভুঁড়ি ভালোভাবে ফেলে দেওয়া উচিত। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় অংশ মাছের অন্ত্রে জমা থাকে। মাছ পরিষ্কার করার সময় প্রবাহিত পানিতে ধোয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।


এ ছাড়া দূষিত নদীর বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছ বা তুলনামূলক নিরাপদ উৎসের মাছ বেছে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব।

এখন কী করা জরুরি

পরিবেশবিদদের দাবি, নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধন বাধ্যতামূলক করা, নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা এবং প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

তাদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে নদী, সুন্দরবন ও মানুষের স্বাস্থ্য—সবকিছুই আরও বড় বিপদের দিকে এগোবে।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর