রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়–এর শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশীদকে রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের এক মাসের বেশি সময় পর তাকে আটক করা হলো।
শনিবার (১৬ মে) দিবাগত রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। মামলায় এর আগে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। শনিবার সন্ধ্যার পর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দীন।
গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আলোচিত আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে। সেই রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড, কয়েকজনকে যাবজ্জীবন এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনাগুলো ছিল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। যদিও মামলার বেশ কয়েকজন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন।
অন্যদিকে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান, রবিউল ইসলাম ও বিভূতিভূষণ রায় এখনো পলাতক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
রায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কয়েকজন শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকেও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডলকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে তারা বর্তমানে পলাতক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি গ্রেপ্তার রয়েছেন। আরেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তাকে এখনো আটক করা যায়নি।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, সাবেক নিরাপত্তাকর্মী নুর আলম মিয়া, সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমানসহ আরও কয়েকজন কর্মচারীকেও বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলায় রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেন এবং অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকেও পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা সবাই পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনটির কয়েকজন সাবেক নেতা—মাহাফুজুর রহমান, ফজলে রাব্বি, আখতার হোসেন, সেজান আহম্মেদ, ধনঞ্জয় কুমার ও বাবুল হোসেনকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রনেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ বর্তমানে কারাগারে আছেন।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড রংপুরের শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি ঘটনা। ঘটনার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের একাংশ বিচার দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা, পুলিশি পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এলে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। কারণ এমন ঘটনায় শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি হয় না, পুরো শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
ড. হাসিবুর রশীদকে গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
তবে মামলার রায় কার্যকর এবং পলাতকদের আইনের আওতায় আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসনিক সংস্কার ও কার্যকর নজরদারির দাবিও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

রোববার, ১৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়–এর শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশীদকে রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের এক মাসের বেশি সময় পর তাকে আটক করা হলো।
শনিবার (১৬ মে) দিবাগত রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। মামলায় এর আগে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। শনিবার সন্ধ্যার পর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দীন।
গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আলোচিত আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে। সেই রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড, কয়েকজনকে যাবজ্জীবন এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনাগুলো ছিল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। যদিও মামলার বেশ কয়েকজন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন।
অন্যদিকে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান, রবিউল ইসলাম ও বিভূতিভূষণ রায় এখনো পলাতক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
রায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কয়েকজন শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকেও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডলকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে তারা বর্তমানে পলাতক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি গ্রেপ্তার রয়েছেন। আরেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তাকে এখনো আটক করা যায়নি।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, সাবেক নিরাপত্তাকর্মী নুর আলম মিয়া, সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমানসহ আরও কয়েকজন কর্মচারীকেও বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলায় রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেন এবং অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকেও পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা সবাই পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনটির কয়েকজন সাবেক নেতা—মাহাফুজুর রহমান, ফজলে রাব্বি, আখতার হোসেন, সেজান আহম্মেদ, ধনঞ্জয় কুমার ও বাবুল হোসেনকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রনেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ বর্তমানে কারাগারে আছেন।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড রংপুরের শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি ঘটনা। ঘটনার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের একাংশ বিচার দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা, পুলিশি পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এলে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। কারণ এমন ঘটনায় শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি হয় না, পুরো শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
ড. হাসিবুর রশীদকে গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
তবে মামলার রায় কার্যকর এবং পলাতকদের আইনের আওতায় আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসনিক সংস্কার ও কার্যকর নজরদারির দাবিও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

আপনার মতামত লিখুন