দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যখন নানা সময়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, ঠিক তখনই বড় আকারের ডিজেল চালান এসে পৌঁছানো কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা ৫৩ হাজার ৬০০ টন ডিজেল নিয়ে দুইটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে—যা দেশের চলমান চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার (২ মে) স্থানীয় শিপিং এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, আমদানিকৃত এই ডিজেল দিয়ে দেশের গড়ে প্রায় চার দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
শিপিং সূত্রে জানা গেছে, চীন থেকে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘লিলা কিংস্টন’ নামের একটি জাহাজ ১৯ হাজার টন ডিজেল নিয়ে শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। এর পরদিন শনিবার ভোরে পানামার পতাকাবাহী ‘প্রাইভেট সোলানা’ জাহাজটি আরও ৩৪ হাজার ৬০০ টন ডিজেল নিয়ে কুতুবদিয়া এঙ্করেজে ভিড়ে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটিতে। এর মধ্যে ডলফিন জেটিতে দুইটি জাহাজ অবস্থান করছে এবং বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রয়েছে আরও কয়েকটি।
প্রাইড শিপিং লাইনের ম্যানেজিং পার্টনার নজরুল ইসলাম বলেন, “একটি জাহাজ থেকে ইতোমধ্যে লাইটারিং কার্যক্রম চলছে। নতুন করে দুইটি জাহাজ আসায় সরবরাহ কার্যক্রম আরও গতি পাবে বলে আশা করছি।”
বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। সে হিসেবে নতুন এই চালান প্রায় চার দিনের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বড় চালান একসাথে আসলে তা বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়। বিশেষ করে কৃষি মৌসুম, পরিবহন খাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের চাহিদা বাড়ার সময় এ ধরনের আমদানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন জ্বালানি বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দেশে ডিজেলের ব্যবহার বহুমুখী। হঠাৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে তা সরাসরি পরিবহন ও কৃষিতে প্রভাব ফেলে। তাই এ ধরনের নিয়মিত আমদানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে মোট ২০টি জাহাজে করে প্রায় ৬ লাখ ৫ হাজার ২২৭ টন জ্বালানি আমদানি করা হয়েছে।
মে মাসেও প্রায় একই মাত্রার আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি মাসে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েলসহ মোট ৬ লাখ টন জ্বালানি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকার জ্বালানি সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগাম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
যদিও বড় চালান আসা স্বস্তির খবর, তবে জ্বালানি খাতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম, জাহাজ খালাসের গতি, লাইটারিং প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন—সবকিছু মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে হয়।
বন্দর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “জাহাজ আসার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দ্রুত খালাস ও বিতরণ। যদি কোনো কারণে বিলম্ব হয়, তাহলে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হতে পারে।”
চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু পরিবহন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে তাদের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন থাকে। তবে অতীতে কখনও কখনও সরবরাহে বিলম্বের কারণে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
একজন ট্রাক মালিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবস্থায় বলেন, “ডিজেল সময়মতো না পেলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এতে পণ্য পরিবহনেও প্রভাব পড়ে। তাই নিয়মিত সরবরাহ খুবই জরুরি।”
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে টেকসই রাখতে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আমদানি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়—বরং সংরক্ষণ, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।
বিপিসি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাও আধুনিকায়নের দাবি উঠছে।
একজন সাবেক জ্বালানি কর্মকর্তা বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে হলে শুধু আমদানি নয়, স্টোরেজ ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।”
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অতীতে কিছু অনিয়ম ও বিলম্বের অভিযোগ উঠলেও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নতুন এই চালান দেশের জ্বালানি খাতে স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়বে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীন ও ভারত থেকে আসা ৫৩ হাজার টনের বেশি ডিজেল দেশের জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিলেও, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। ধারাবাহিক আমদানি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে জ্বালানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
সরবরাহের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যখন নানা সময়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, ঠিক তখনই বড় আকারের ডিজেল চালান এসে পৌঁছানো কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা ৫৩ হাজার ৬০০ টন ডিজেল নিয়ে দুইটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে—যা দেশের চলমান চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার (২ মে) স্থানীয় শিপিং এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, আমদানিকৃত এই ডিজেল দিয়ে দেশের গড়ে প্রায় চার দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
শিপিং সূত্রে জানা গেছে, চীন থেকে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘লিলা কিংস্টন’ নামের একটি জাহাজ ১৯ হাজার টন ডিজেল নিয়ে শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। এর পরদিন শনিবার ভোরে পানামার পতাকাবাহী ‘প্রাইভেট সোলানা’ জাহাজটি আরও ৩৪ হাজার ৬০০ টন ডিজেল নিয়ে কুতুবদিয়া এঙ্করেজে ভিড়ে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটিতে। এর মধ্যে ডলফিন জেটিতে দুইটি জাহাজ অবস্থান করছে এবং বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রয়েছে আরও কয়েকটি।
প্রাইড শিপিং লাইনের ম্যানেজিং পার্টনার নজরুল ইসলাম বলেন, “একটি জাহাজ থেকে ইতোমধ্যে লাইটারিং কার্যক্রম চলছে। নতুন করে দুইটি জাহাজ আসায় সরবরাহ কার্যক্রম আরও গতি পাবে বলে আশা করছি।”
বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। সে হিসেবে নতুন এই চালান প্রায় চার দিনের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বড় চালান একসাথে আসলে তা বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়। বিশেষ করে কৃষি মৌসুম, পরিবহন খাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের চাহিদা বাড়ার সময় এ ধরনের আমদানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন জ্বালানি বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দেশে ডিজেলের ব্যবহার বহুমুখী। হঠাৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে তা সরাসরি পরিবহন ও কৃষিতে প্রভাব ফেলে। তাই এ ধরনের নিয়মিত আমদানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে মোট ২০টি জাহাজে করে প্রায় ৬ লাখ ৫ হাজার ২২৭ টন জ্বালানি আমদানি করা হয়েছে।
মে মাসেও প্রায় একই মাত্রার আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি মাসে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েলসহ মোট ৬ লাখ টন জ্বালানি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকার জ্বালানি সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগাম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
যদিও বড় চালান আসা স্বস্তির খবর, তবে জ্বালানি খাতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম, জাহাজ খালাসের গতি, লাইটারিং প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন—সবকিছু মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে হয়।
বন্দর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “জাহাজ আসার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দ্রুত খালাস ও বিতরণ। যদি কোনো কারণে বিলম্ব হয়, তাহলে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হতে পারে।”
চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু পরিবহন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে তাদের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন থাকে। তবে অতীতে কখনও কখনও সরবরাহে বিলম্বের কারণে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
একজন ট্রাক মালিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবস্থায় বলেন, “ডিজেল সময়মতো না পেলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এতে পণ্য পরিবহনেও প্রভাব পড়ে। তাই নিয়মিত সরবরাহ খুবই জরুরি।”
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে টেকসই রাখতে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আমদানি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়—বরং সংরক্ষণ, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।
বিপিসি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাও আধুনিকায়নের দাবি উঠছে।
একজন সাবেক জ্বালানি কর্মকর্তা বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে হলে শুধু আমদানি নয়, স্টোরেজ ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।”
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অতীতে কিছু অনিয়ম ও বিলম্বের অভিযোগ উঠলেও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নতুন এই চালান দেশের জ্বালানি খাতে স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়বে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীন ও ভারত থেকে আসা ৫৩ হাজার টনের বেশি ডিজেল দেশের জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিলেও, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। ধারাবাহিক আমদানি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে জ্বালানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
সরবরাহের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন