দেশজুড়ে আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে এক হাজারের বেশি শিশুর শরীরে এই রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টার মধ্যে দেশে ১ হাজার ২৪ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ৭২ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ২৪ ঘণ্টায় ঢাকাতেই চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের শরীরে হামের উপসর্গ ছিল বলে জানানো হয়েছে। এতে করে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৫ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪৯ শিশু।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একই সময়ের মধ্যে দেশে মোট ৩৯ হাজার ৩২৫ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৬ হাজার ৯১১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যদিও আশার কথা হচ্ছে, চিকিৎসা নিয়ে এর মধ্যে ২৩ হাজার ২২৫ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
এছাড়া, গত দেড় মাসে ৫ হাজার ২১৮ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, শিশু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদের সন্তানের শরীরে হঠাৎ জ্বর, চোখ লাল হওয়া এবং পরে গায়ে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার পর তারা হাসপাতালে আসেন।
একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রথমে আমরা বুঝতেই পারিনি এটা হাম। জ্বর কমছিল না, পরে শরীরে দানা ওঠে। তখনই হাসপাতালে নিয়ে আসি।”
হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ায় জটিলতা বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের টিকা সম্পূর্ণ হয়নি, তাদের ঝুঁকি বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে সংক্রমণ বাড়তে পারে।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। কিন্তু অনেক এলাকায় এখনও টিকার আওতায় সব শিশু আসেনি। এটাই বড় একটি কারণ হতে পারে।”
এছাড়া, মৌসুমি পরিবর্তন, জনসচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবায় বিলম্বও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্য খাতেই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে, হাসপাতালে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং শিশু মৃত্যুর হার বাড়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
তবে মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক এলাকাবাসীর দাবি, এখনও যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়নি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “গ্রামে অনেকেই এখনও জানে না হাম কতটা বিপজ্জনক। টিকা নেওয়ার ব্যাপারেও অনেকে উদাসীন।”
কিছু অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেশে হামের সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তা নিঃসন্দেহে একটি বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন—টিকাদান বাড়ানো, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
অন্যথায়, এই সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে—যার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজে।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
দেশজুড়ে আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে এক হাজারের বেশি শিশুর শরীরে এই রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টার মধ্যে দেশে ১ হাজার ২৪ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ৭২ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ২৪ ঘণ্টায় ঢাকাতেই চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের শরীরে হামের উপসর্গ ছিল বলে জানানো হয়েছে। এতে করে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৫ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪৯ শিশু।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একই সময়ের মধ্যে দেশে মোট ৩৯ হাজার ৩২৫ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৬ হাজার ৯১১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যদিও আশার কথা হচ্ছে, চিকিৎসা নিয়ে এর মধ্যে ২৩ হাজার ২২৫ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
এছাড়া, গত দেড় মাসে ৫ হাজার ২১৮ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, শিশু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদের সন্তানের শরীরে হঠাৎ জ্বর, চোখ লাল হওয়া এবং পরে গায়ে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার পর তারা হাসপাতালে আসেন।
একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রথমে আমরা বুঝতেই পারিনি এটা হাম। জ্বর কমছিল না, পরে শরীরে দানা ওঠে। তখনই হাসপাতালে নিয়ে আসি।”
হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ায় জটিলতা বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের টিকা সম্পূর্ণ হয়নি, তাদের ঝুঁকি বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে সংক্রমণ বাড়তে পারে।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। কিন্তু অনেক এলাকায় এখনও টিকার আওতায় সব শিশু আসেনি। এটাই বড় একটি কারণ হতে পারে।”
এছাড়া, মৌসুমি পরিবর্তন, জনসচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবায় বিলম্বও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্য খাতেই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে, হাসপাতালে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং শিশু মৃত্যুর হার বাড়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
তবে মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক এলাকাবাসীর দাবি, এখনও যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়নি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “গ্রামে অনেকেই এখনও জানে না হাম কতটা বিপজ্জনক। টিকা নেওয়ার ব্যাপারেও অনেকে উদাসীন।”
কিছু অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেশে হামের সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তা নিঃসন্দেহে একটি বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন—টিকাদান বাড়ানো, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
অন্যথায়, এই সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে—যার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজে।

আপনার মতামত লিখুন