একটি বাসে নিরাপদে যাত্রা করার কথা, অথচ কখনো সেই বাসেই নারী বা কিশোরী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কখনো যাত্রীকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে নির্জন স্থানে। আবার ভাড়া নিয়ে বিরোধ, ছিনতাই কিংবা অর্থের লোভে যাত্রীকে মারধরের ঘটনাও সামনে আসছে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও একের পর এক এমন অভিযোগ গণপরিবহনে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে—পরিবহন শ্রমিকদের অপরাধপ্রবণতা বন্ধ করবে কে, আর যাত্রীদের নিরাপত্তার দায় নেবে কারা?
পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, দেশে বিপুলসংখ্যক পরিবহন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের মধ্যে কে অপরাধে জড়িত হতে পারেন, তা শনাক্ত করা কঠিন। তবে অপরাধ ঠেকাতে শ্রমিকদের নিয়মিত যাচাই, ডোপ টেস্ট, প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে এক ছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে চালক, হেলপারসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়। এর আগে একই মহাসড়কে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়।
২০১৭ সালে চলন্ত বাসে রূপা খাতুন নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় বাসের চালক ও সহকারীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয় এবং সাজা দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েলকে বাস থেকে ফেলে হত্যার ঘটনাও যাত্রী নিরাপত্তার ভয়াবহ চিত্র সামনে আনে।
এ ছাড়া ঢাকার কাছে ধামরাইয়ে চলন্ত বাসে এক পোশাকশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ, জমি বিক্রির টাকা ছিনিয়ে নিতে ইসমাইল নামে এক যাত্রীকে বাসের ভেতর হত্যার অভিযোগে চালক, হেলপার ও সুপারভাইজারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—একটি অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের আগেই তা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
তিনি মনে করেন, শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার সময় ডোপ টেস্ট করলেই হবে না। সড়ক-মহাসড়কে নিয়মিত ডোপ টেস্ট চালু করা দরকার, যাতে মাদকাসক্ত শ্রমিকদের শনাক্ত করা যায়।
তবে মাদকাসক্তি কোনো অপরাধের অজুহাত হতে পারে না। একজন শ্রমিক মাদক গ্রহণ করলেও তার হাতে যাত্রীদের নিরাপত্তা তুলে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত—এ প্রশ্নের উত্তর পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও প্রশাসনকে একসঙ্গে দিতে হবে।
তিনি জানান, শ্রমিকদের সচেতন করতে মাসিক ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে শুধু মালিক সমিতির উদ্যোগে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। শ্রমিক সংগঠন, পরিবহন মালিক, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, পরিবহন খাতে শ্রমিক নিয়োগ ও দায়িত্ব দেওয়ার আগে যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। কারণ একজন চালক বা সহকারীর হাতে শুধু গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নয়, একসঙ্গে বহু মানুষের নিরাপত্তাও থাকে।
বাসচালক, হেলপার ও সুপারভাইজারদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন কঠিন পরিবেশে কাজ করেন এবং দায়িত্বশীলভাবে যাত্রী পরিবহন করেন। কিন্তু নিয়োগের সময় যথাযথ যাচাই না থাকা, কর্মীদের আচরণ পর্যবেক্ষণের অভাব, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত না হলে অপরাধী ব্যক্তিরা ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারেন।
এ কারণে সমাধান শুধু সচেতনতামূলক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, মাদকমুক্তি কর্মসূচি, বিশ্রামের সুযোগ, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অপরাধে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা—সবকিছু একসঙ্গে দরকার।
যাত্রীরা বাসে ওঠার পর চালক, হেলপার বা সুপারভাইজারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। তাই পরিবহন শ্রমিকদের আচরণ, পরিচয় ও দায়িত্ব সম্পর্কে যাত্রীদের আস্থা থাকা জরুরি। বাসে সিসিটিভি, জরুরি হেল্পলাইন, চালকের পরিচয় দৃশ্যমান রাখা এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার থাকলে যাত্রীদের নিরাপত্তা কিছুটা বাড়তে পারে।
তবে কোনো ঘটনার অভিযোগ উঠলেই তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর অভিযোগকে অবহেলা না করে দ্রুত তদন্ত ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
১. পরিবহন শ্রমিক নিয়োগের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র, ঠিকানা ও পূর্বের অপরাধের তথ্য যাচাই।
২. নিয়মিত ও আকস্মিক ডোপ টেস্ট চালু করা।
৩. বাসে সিসিটিভি ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখা।
৪. চালক-হেলপারদের আচরণ, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং যাত্রী অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৫. রাতের দূরপাল্লার বাসে নির্দিষ্ট বিরতি, পর্যবেক্ষণ ও যাত্রী অভিযোগের ব্যবস্থা রাখা।
৬. অভিযোগের পর মালিক সমিতির অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি পুলিশের আইনগত তদন্ত নিশ্চিত করা।
একজন অপরাধী শ্রমিককে শনাক্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি—যেখানে কোনো শ্রমিক অপরাধ করার সুযোগ না পান এবং কোনো যাত্রী বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা পান। গণপরিবহন নিরাপদ করতে হলে ‘অপরাধের পর ব্যবস্থা’ নয়, ‘অপরাধের আগেই প্রতিরোধ’—এই নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একটি বাসে নিরাপদে যাত্রা করার কথা, অথচ কখনো সেই বাসেই নারী বা কিশোরী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কখনো যাত্রীকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে নির্জন স্থানে। আবার ভাড়া নিয়ে বিরোধ, ছিনতাই কিংবা অর্থের লোভে যাত্রীকে মারধরের ঘটনাও সামনে আসছে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও একের পর এক এমন অভিযোগ গণপরিবহনে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে—পরিবহন শ্রমিকদের অপরাধপ্রবণতা বন্ধ করবে কে, আর যাত্রীদের নিরাপত্তার দায় নেবে কারা?
পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, দেশে বিপুলসংখ্যক পরিবহন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের মধ্যে কে অপরাধে জড়িত হতে পারেন, তা শনাক্ত করা কঠিন। তবে অপরাধ ঠেকাতে শ্রমিকদের নিয়মিত যাচাই, ডোপ টেস্ট, প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে এক ছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে চালক, হেলপারসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়। এর আগে একই মহাসড়কে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়।
২০১৭ সালে চলন্ত বাসে রূপা খাতুন নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় বাসের চালক ও সহকারীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয় এবং সাজা দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েলকে বাস থেকে ফেলে হত্যার ঘটনাও যাত্রী নিরাপত্তার ভয়াবহ চিত্র সামনে আনে।
এ ছাড়া ঢাকার কাছে ধামরাইয়ে চলন্ত বাসে এক পোশাকশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ, জমি বিক্রির টাকা ছিনিয়ে নিতে ইসমাইল নামে এক যাত্রীকে বাসের ভেতর হত্যার অভিযোগে চালক, হেলপার ও সুপারভাইজারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—একটি অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের আগেই তা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
তিনি মনে করেন, শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার সময় ডোপ টেস্ট করলেই হবে না। সড়ক-মহাসড়কে নিয়মিত ডোপ টেস্ট চালু করা দরকার, যাতে মাদকাসক্ত শ্রমিকদের শনাক্ত করা যায়।
তবে মাদকাসক্তি কোনো অপরাধের অজুহাত হতে পারে না। একজন শ্রমিক মাদক গ্রহণ করলেও তার হাতে যাত্রীদের নিরাপত্তা তুলে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত—এ প্রশ্নের উত্তর পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও প্রশাসনকে একসঙ্গে দিতে হবে।
তিনি জানান, শ্রমিকদের সচেতন করতে মাসিক ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে শুধু মালিক সমিতির উদ্যোগে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। শ্রমিক সংগঠন, পরিবহন মালিক, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, পরিবহন খাতে শ্রমিক নিয়োগ ও দায়িত্ব দেওয়ার আগে যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। কারণ একজন চালক বা সহকারীর হাতে শুধু গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নয়, একসঙ্গে বহু মানুষের নিরাপত্তাও থাকে।
বাসচালক, হেলপার ও সুপারভাইজারদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন কঠিন পরিবেশে কাজ করেন এবং দায়িত্বশীলভাবে যাত্রী পরিবহন করেন। কিন্তু নিয়োগের সময় যথাযথ যাচাই না থাকা, কর্মীদের আচরণ পর্যবেক্ষণের অভাব, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত না হলে অপরাধী ব্যক্তিরা ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারেন।
এ কারণে সমাধান শুধু সচেতনতামূলক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, মাদকমুক্তি কর্মসূচি, বিশ্রামের সুযোগ, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অপরাধে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা—সবকিছু একসঙ্গে দরকার।
যাত্রীরা বাসে ওঠার পর চালক, হেলপার বা সুপারভাইজারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। তাই পরিবহন শ্রমিকদের আচরণ, পরিচয় ও দায়িত্ব সম্পর্কে যাত্রীদের আস্থা থাকা জরুরি। বাসে সিসিটিভি, জরুরি হেল্পলাইন, চালকের পরিচয় দৃশ্যমান রাখা এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার থাকলে যাত্রীদের নিরাপত্তা কিছুটা বাড়তে পারে।
তবে কোনো ঘটনার অভিযোগ উঠলেই তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর অভিযোগকে অবহেলা না করে দ্রুত তদন্ত ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
১. পরিবহন শ্রমিক নিয়োগের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র, ঠিকানা ও পূর্বের অপরাধের তথ্য যাচাই।
২. নিয়মিত ও আকস্মিক ডোপ টেস্ট চালু করা।
৩. বাসে সিসিটিভি ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখা।
৪. চালক-হেলপারদের আচরণ, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং যাত্রী অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৫. রাতের দূরপাল্লার বাসে নির্দিষ্ট বিরতি, পর্যবেক্ষণ ও যাত্রী অভিযোগের ব্যবস্থা রাখা।
৬. অভিযোগের পর মালিক সমিতির অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি পুলিশের আইনগত তদন্ত নিশ্চিত করা।
একজন অপরাধী শ্রমিককে শনাক্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি—যেখানে কোনো শ্রমিক অপরাধ করার সুযোগ না পান এবং কোনো যাত্রী বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা পান। গণপরিবহন নিরাপদ করতে হলে ‘অপরাধের পর ব্যবস্থা’ নয়, ‘অপরাধের আগেই প্রতিরোধ’—এই নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন