দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের নেপথ্যে কী? পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন, দলীয় দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের নেপথ্যে কী? পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন, দলীয় দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ

মান্দার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ সুপার, আটক দুই; প্রকৃত জড়িতদের খুঁজছে পুলিশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দোকানের জায়গা নিয়ে সংঘর্ষ, ২০ জন আহত; গ্রেপ্তার ৫

শেরপুরে একই মাদরাসার তিন শিশুসহ পাঁচজন নিখোঁজ, উৎকণ্ঠায় পরিবার; তদন্তে পুলিশ

কটিয়াদীতে বাবার মৃত্যুতে ঢোল-বাঁশি বাজানোর কাণ্ড: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়, ক্ষমা চাইলেন সন্তান

ঢামেক মর্গে এক সপ্তাহ ধরে বিকল ফ্রিজার, মেঝেতে রাখা মরদেহে আলামত নষ্ট হওয়ার শঙ্কা

নিয়ামতপুরে ৯০ কেজি গাঁজাসহ দুইজন গ্রেপ্তার, উদ্ধারকৃত মাদকের মূল্য ৪০ লাখ টাকা

রামপুরায় ১৪৭ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অভিযোগে সড়ক অবরোধ, দুই ঘণ্টা স্থবির ছিল যান চলাচল

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের নেপথ্যে কী? পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন, দলীয় দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের নেপথ্যে কী? পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন, দলীয় দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ
রাঙামাটিতে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে দীপেন দেওয়ানকে পুনরায় মন্ত্রী করার দাবি জানান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। -ছবি: সংগৃহীত

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ও রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাঁর সমর্থকদের আন্দোলন থামেনি। রাঙামাটিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে তাঁকে আবার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি তুলেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদিকে তাঁর পদত্যাগের পেছনে দলীয় কোন্দল, পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনে বিলম্ব এবং রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ সামনে এসেছে।


দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন মন্ত্রিত্ব ছাড়েন দীপেন দেওয়ান। এরপর থেকেই তাঁর পদত্যাগের কারণ নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি, তবে দলীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জেলা পরিষদ গঠন নিয়েই শুরু জটিলতা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে তুলনামূলক কম চাপ থাকলেও মূল সংকট তৈরি হয় রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদকে কেন্দ্র করে। চেয়ারম্যান পদে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি আগ্রহ দেখান এবং তাঁদের পক্ষে বিভিন্ন মহল থেকে তদবিরও চলতে থাকে।

বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য জোরালো চেষ্টা চালান। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কাউকে দায়িত্ব দিতে অনাগ্রহী ছিলেন সাবেক এই মন্ত্রী। কারণ হিসেবে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও কার্যকর নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসে বলে দাবি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে দলীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন ধরে রাখা নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়েও চাপ ছিল। সেই বিবেচনায় জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর নাম আলোচনায় এগিয়ে আসে। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব ও মতবিরোধের কারণে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

‘পরিবারতন্ত্র’ বিতর্কে নতুন সমীকরণ

দলীয় সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন দীপন তালুকদারের বড় ভাই কাজল তালুকদার। ফলে একই পরিবারের আরেক সদস্যকে চেয়ারম্যান করা হলে সেটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।

এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে বিএনপির সহ-উপজাতিবিষয়ক সম্পাদক কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ানের নাম সামনে আনা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মনীষ দেওয়ান দাবি করেন, তাঁর নাম প্রস্তাব করার কারণেই দীপেন দেওয়ান রাজনৈতিক চাপে পড়েছিলেন।

যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত বা দলীয় ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হলেও সেগুলোর পূর্ণ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বৈসাবী উৎসব থেকে প্রকাশ্যে আসে বিরোধ?

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচিত আরেকটি ঘটনা হলো বৈসাবী উৎসবকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি। অভিযোগ উঠেছে, রাঙামাটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় একটি রাজনৈতিক বলয়ের উদ্যোগে।


একই সময়ে দীপেন দেওয়ান বান্দরবানে সাংগ্রাই উৎসবে অংশ নিতে যান। এরপর এ বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দেওয়া হয় বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয় ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই দ্বন্দ্বকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

‘কান ভারী’ করার অভিযোগ কতটা সত্য?

দলীয় একটি অংশের দাবি, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনে বিলম্বকে ইস্যু বানিয়ে দীপেন দেওয়ানের বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এতে তিনি আরও চাপে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু। তাঁর বক্তব্য, দলের ভেতরে এমন কোনো কোন্দলের বিষয় সঠিক নয়। তিনি বলেন, দীপেন দেওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং কখনো দলীয় চাপের কথা তাঁদের কাছে তুলে ধরেননি।

অন্যদিকে দীপেন দেওয়ান এর আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তিনি যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করতে চেয়েছিলেন। কোনো জনগোষ্ঠী যাতে বঞ্চিত না হয় এবং সিদ্ধান্তে বৈষম্যের অভিযোগ না 

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক চাপ ও নানা ধরনের বাধার কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি যোগাযোগ করা হলে তিনি নতুন করে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

রাঙামাটিতে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর পরিস্থিতি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই। রাঙামাটিতে সাধারণ মানুষের একটি অংশও তাঁর পক্ষে সরব হয়েছে।

সোমবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘রাঙামাটির নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে দীপেন দেওয়ান ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন। তাই তাঁকে পুনরায় মন্ত্রিত্বে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

কেন বারবার সামনে আসে দলীয় কোন্দল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি শুধু দলীয় সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে জাতিগত, আঞ্চলিক ও সাংগঠনিক ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে একটি পদ বা নিয়োগকে ঘিরে বহুস্তরীয় চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নিয়োগ প্রক্রিয়া না থাকলে এ ধরনের বিরোধ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে রাজনৈতিক সংকট দ্রুত ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এখনো পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা আলোচনা চললেও স্পষ্টভাবে একটি বিষয় সামনে এসেছে—পার্বত্য রাজনীতির ভেতরে ক্ষমতার সমীকরণ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্নে টানাপোড়েন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

বিষয় : দীপেন দেওয়ান, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়,

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬


দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের নেপথ্যে কী? পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন, দলীয় দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬

featured Image

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ও রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাঁর সমর্থকদের আন্দোলন থামেনি। রাঙামাটিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে তাঁকে আবার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি তুলেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদিকে তাঁর পদত্যাগের পেছনে দলীয় কোন্দল, পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনে বিলম্ব এবং রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ সামনে এসেছে।


দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন মন্ত্রিত্ব ছাড়েন দীপেন দেওয়ান। এরপর থেকেই তাঁর পদত্যাগের কারণ নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি, তবে দলীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জেলা পরিষদ গঠন নিয়েই শুরু জটিলতা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে তুলনামূলক কম চাপ থাকলেও মূল সংকট তৈরি হয় রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদকে কেন্দ্র করে। চেয়ারম্যান পদে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি আগ্রহ দেখান এবং তাঁদের পক্ষে বিভিন্ন মহল থেকে তদবিরও চলতে থাকে।

বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য জোরালো চেষ্টা চালান। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কাউকে দায়িত্ব দিতে অনাগ্রহী ছিলেন সাবেক এই মন্ত্রী। কারণ হিসেবে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও কার্যকর নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসে বলে দাবি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে দলীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন ধরে রাখা নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়েও চাপ ছিল। সেই বিবেচনায় জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর নাম আলোচনায় এগিয়ে আসে। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব ও মতবিরোধের কারণে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

‘পরিবারতন্ত্র’ বিতর্কে নতুন সমীকরণ

দলীয় সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন দীপন তালুকদারের বড় ভাই কাজল তালুকদার। ফলে একই পরিবারের আরেক সদস্যকে চেয়ারম্যান করা হলে সেটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।

এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে বিএনপির সহ-উপজাতিবিষয়ক সম্পাদক কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ানের নাম সামনে আনা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মনীষ দেওয়ান দাবি করেন, তাঁর নাম প্রস্তাব করার কারণেই দীপেন দেওয়ান রাজনৈতিক চাপে পড়েছিলেন।

যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত বা দলীয় ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হলেও সেগুলোর পূর্ণ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বৈসাবী উৎসব থেকে প্রকাশ্যে আসে বিরোধ?

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচিত আরেকটি ঘটনা হলো বৈসাবী উৎসবকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি। অভিযোগ উঠেছে, রাঙামাটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় একটি রাজনৈতিক বলয়ের উদ্যোগে।


একই সময়ে দীপেন দেওয়ান বান্দরবানে সাংগ্রাই উৎসবে অংশ নিতে যান। এরপর এ বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দেওয়া হয় বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয় ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই দ্বন্দ্বকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

‘কান ভারী’ করার অভিযোগ কতটা সত্য?

দলীয় একটি অংশের দাবি, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনে বিলম্বকে ইস্যু বানিয়ে দীপেন দেওয়ানের বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এতে তিনি আরও চাপে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু। তাঁর বক্তব্য, দলের ভেতরে এমন কোনো কোন্দলের বিষয় সঠিক নয়। তিনি বলেন, দীপেন দেওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং কখনো দলীয় চাপের কথা তাঁদের কাছে তুলে ধরেননি।

অন্যদিকে দীপেন দেওয়ান এর আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তিনি যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করতে চেয়েছিলেন। কোনো জনগোষ্ঠী যাতে বঞ্চিত না হয় এবং সিদ্ধান্তে বৈষম্যের অভিযোগ না 

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক চাপ ও নানা ধরনের বাধার কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি যোগাযোগ করা হলে তিনি নতুন করে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

রাঙামাটিতে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর পরিস্থিতি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই। রাঙামাটিতে সাধারণ মানুষের একটি অংশও তাঁর পক্ষে সরব হয়েছে।

সোমবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘রাঙামাটির নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে দীপেন দেওয়ান ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন। তাই তাঁকে পুনরায় মন্ত্রিত্বে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

কেন বারবার সামনে আসে দলীয় কোন্দল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি শুধু দলীয় সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে জাতিগত, আঞ্চলিক ও সাংগঠনিক ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে একটি পদ বা নিয়োগকে ঘিরে বহুস্তরীয় চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নিয়োগ প্রক্রিয়া না থাকলে এ ধরনের বিরোধ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে রাজনৈতিক সংকট দ্রুত ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এখনো পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা আলোচনা চললেও স্পষ্টভাবে একটি বিষয় সামনে এসেছে—পার্বত্য রাজনীতির ভেতরে ক্ষমতার সমীকরণ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্নে টানাপোড়েন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর