উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুত করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এবার শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব দিলেই চলবে না; বরং এমন একটি বাজেট প্রয়োজন, যা দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে, বিনিয়োগ টানবে এবং ডিজিটাল ও লজিস্টিক্স ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করবে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের সমন্বয়ই আগামী দিনের অর্থনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে। তাই ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
বাংলাদেশে উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় খরচ তুলনামূলক বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দেশে লজিস্টিক্স ব্যয় মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। উন্নত অর্থনীতিতে যেখানে এই হার প্রায় অর্ধেক, সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এখনও পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, রেলপথে কন্টেইনার পরিবহনের সীমিত সুযোগ এবং আধুনিক গুদাম ব্যবস্থার অভাব দেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে ধীর করে দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন বাজেটে ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোর, পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দরের সংযোগ অবকাঠামো, ড্রাই পোর্ট এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এতে শুধু রপ্তানি নয়, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী হতে পারে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয় সড়কপথে। এতে সময় ও খরচ—দুইই বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মহাসড়কে যানজট, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবহন বিলম্বের কারণে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় রেলভিত্তিক কন্টেইনার পরিবহন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারে প্রণোদনার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দীর্ঘমেয়াদে লজিস্টিক্স খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চলগুলোতে আলাদা লজিস্টিক্স জোন তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পাঞ্চলের কাছে গুদাম, কাস্টমস সেবা ও দ্রুত পরিবহন সুবিধা থাকলে উৎপাদন ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই গতি বাড়বে।
ব্যবসা নিবন্ধন, কর, ভ্যাট কিংবা কাস্টমস সেবার অনেক কিছুই এখন অনলাইনে হলেও পুরো ব্যবস্থায় এখনও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্যভান্ডার একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকায় ব্যবসায়ীদের বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এবার বাজেটে সমন্বিত ডিজিটাল গভর্নেন্সকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ সরকারি সেবাগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার পাশাপাশি ডাটা শেয়ারিং ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ডিজিটাল প্রশাসন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রশাসনিক ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু করের হার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন সম্ভব নয়। বরং কর প্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করা বেশি জরুরি।
এক্ষেত্রে AI-ভিত্তিক কর নিরীক্ষা, ই-ইনভয়েসিং এবং স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থার মতো উদ্যোগের কথা সামনে আসছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা চালু হলে কর ফাঁকি কমবে এবং রাজস্ব আদায় আরও বাড়তে পারে।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি অংশ সতর্ক করে বলছে, নতুন প্রযুক্তি চালুর আগে ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত না হলে ছোট উদ্যোক্তারা চাপে পড়তে পারেন।
দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেবার ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ৫জি অবকাঠামো, জাতীয় ডাটা সেন্টার, ক্লাউড সেবা ও সাইবার নিরাপত্তায় বড় বিনিয়োগ ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে।
স্টার্টআপ ও ফিনটেক উদ্যোক্তাদের দাবি, নতুন বাজেটে প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনী খাতের জন্য কর সুবিধা এবং ভেঞ্চার ফান্ড গঠন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানির নতুন খাত তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারে কোনো ধাক্কা এলে পুরো অর্থনীতিতেই প্রভাব পড়ে।
এই ঝুঁকি কমাতে ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আইসিটি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিশেষ সহায়তার প্রস্তাব উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং ডিজিটাল ট্রেড সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অপ্রচলিত রপ্তানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।
বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে ব্যয় বাড়ে, আবার কাঙ্ক্ষিত সুফলও পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না; বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
তারা বলছেন, প্রকল্প মনিটরিং, ই-গভর্নেন্সভিত্তিক ট্র্যাকিং এবং সরকারি ক্রয়ে ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অপচয় ও দুর্নীতি কমতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের কার্যকারিতাও বাড়বে।
তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বড় শক্তি হলেও দক্ষতার ঘাটতি এখনও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কারিগরি শিক্ষা, AI, ডাটা অ্যানালিটিক্স, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং সাইবার নিরাপত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বাজেটে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা শুধু বড় ব্যবসা বা রপ্তানি বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। পরিবহন ব্যয় কমলে পণ্যের দাম কমতে পারে, ডিজিটাল সেবা বাড়লে দুর্নীতি ও হয়রানি কমতে পারে, আর প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়লে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কি শুধু স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর একটি কার্যকর রূপরেখা হয়ে উঠবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, লজিস্টিক্স উন্নয়ন, ডিজিটাল গভর্নেন্স, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া গেলে বাংলাদেশ আগামী দশকের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্ত অবস্থানে যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

রোববার, ১৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুত করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এবার শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব দিলেই চলবে না; বরং এমন একটি বাজেট প্রয়োজন, যা দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে, বিনিয়োগ টানবে এবং ডিজিটাল ও লজিস্টিক্স ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করবে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের সমন্বয়ই আগামী দিনের অর্থনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে। তাই ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
বাংলাদেশে উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় খরচ তুলনামূলক বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দেশে লজিস্টিক্স ব্যয় মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। উন্নত অর্থনীতিতে যেখানে এই হার প্রায় অর্ধেক, সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এখনও পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, রেলপথে কন্টেইনার পরিবহনের সীমিত সুযোগ এবং আধুনিক গুদাম ব্যবস্থার অভাব দেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে ধীর করে দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন বাজেটে ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোর, পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দরের সংযোগ অবকাঠামো, ড্রাই পোর্ট এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এতে শুধু রপ্তানি নয়, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী হতে পারে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয় সড়কপথে। এতে সময় ও খরচ—দুইই বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মহাসড়কে যানজট, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবহন বিলম্বের কারণে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় রেলভিত্তিক কন্টেইনার পরিবহন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারে প্রণোদনার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দীর্ঘমেয়াদে লজিস্টিক্স খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চলগুলোতে আলাদা লজিস্টিক্স জোন তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পাঞ্চলের কাছে গুদাম, কাস্টমস সেবা ও দ্রুত পরিবহন সুবিধা থাকলে উৎপাদন ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই গতি বাড়বে।
ব্যবসা নিবন্ধন, কর, ভ্যাট কিংবা কাস্টমস সেবার অনেক কিছুই এখন অনলাইনে হলেও পুরো ব্যবস্থায় এখনও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্যভান্ডার একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকায় ব্যবসায়ীদের বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এবার বাজেটে সমন্বিত ডিজিটাল গভর্নেন্সকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ সরকারি সেবাগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার পাশাপাশি ডাটা শেয়ারিং ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ডিজিটাল প্রশাসন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রশাসনিক ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু করের হার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন সম্ভব নয়। বরং কর প্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করা বেশি জরুরি।
এক্ষেত্রে AI-ভিত্তিক কর নিরীক্ষা, ই-ইনভয়েসিং এবং স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থার মতো উদ্যোগের কথা সামনে আসছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা চালু হলে কর ফাঁকি কমবে এবং রাজস্ব আদায় আরও বাড়তে পারে।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি অংশ সতর্ক করে বলছে, নতুন প্রযুক্তি চালুর আগে ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত না হলে ছোট উদ্যোক্তারা চাপে পড়তে পারেন।
দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেবার ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ৫জি অবকাঠামো, জাতীয় ডাটা সেন্টার, ক্লাউড সেবা ও সাইবার নিরাপত্তায় বড় বিনিয়োগ ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে।
স্টার্টআপ ও ফিনটেক উদ্যোক্তাদের দাবি, নতুন বাজেটে প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনী খাতের জন্য কর সুবিধা এবং ভেঞ্চার ফান্ড গঠন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানির নতুন খাত তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারে কোনো ধাক্কা এলে পুরো অর্থনীতিতেই প্রভাব পড়ে।
এই ঝুঁকি কমাতে ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আইসিটি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিশেষ সহায়তার প্রস্তাব উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং ডিজিটাল ট্রেড সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অপ্রচলিত রপ্তানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।
বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে ব্যয় বাড়ে, আবার কাঙ্ক্ষিত সুফলও পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না; বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
তারা বলছেন, প্রকল্প মনিটরিং, ই-গভর্নেন্সভিত্তিক ট্র্যাকিং এবং সরকারি ক্রয়ে ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অপচয় ও দুর্নীতি কমতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের কার্যকারিতাও বাড়বে।
তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বড় শক্তি হলেও দক্ষতার ঘাটতি এখনও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কারিগরি শিক্ষা, AI, ডাটা অ্যানালিটিক্স, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং সাইবার নিরাপত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বাজেটে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা শুধু বড় ব্যবসা বা রপ্তানি বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। পরিবহন ব্যয় কমলে পণ্যের দাম কমতে পারে, ডিজিটাল সেবা বাড়লে দুর্নীতি ও হয়রানি কমতে পারে, আর প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়লে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কি শুধু স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর একটি কার্যকর রূপরেখা হয়ে উঠবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, লজিস্টিক্স উন্নয়ন, ডিজিটাল গভর্নেন্স, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া গেলে বাংলাদেশ আগামী দশকের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্ত অবস্থানে যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

আপনার মতামত লিখুন