দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার নদীতে জাল ফেলছেন জেলেরা। কিন্তু মেঘনা ও কীর্তনখোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। জেলেদের দাবি, জালে উঠছে খুব কম মাছ, আর যেগুলো ধরা পড়ছে সেগুলোর বেশিরভাগই ছোট আকারের। মৎস্য কর্মকর্তারাও বলছেন, নদীতে ডুবোচর বেড়ে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে শুধু উৎপাদন নয়, মাছের আকার ও রঙেও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।
মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট, বরিশালের হিজলা ও মুলাদী সংলগ্ন মেঘনা নদী, তার শাখা নদী এবং কীর্তনখোলার বিস্তীর্ণ এলাকায় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। জাটকা সংরক্ষণে নেওয়া এই পদক্ষেপ শেষ হওয়ার পর নদীতে মাছের প্রাচুর্য ফিরবে—এমন প্রত্যাশা ছিল জেলে ও ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
নদীতে নেমে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় হতাশ জেলেরা। মেঘনাপাড়ের মেহেন্দীগঞ্জের জেলে তোফায়েল হোসেন বলেন, টানা দুই মাস নদীতে যেতে পারেননি। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নেমেও আশানুরূপ মাছ মিলছে না। তাঁর ভাষায়, “যা পাওয়া যায়, সেগুলোও ছোট। সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, অনেক জেলে দাদনের টাকায় চলেন। মাছ না মিললে সেই ঋণের চাপ আরও বাড়ে। নদীতে মাছের সংকটের কারণে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বরিশাল সদর উপজেলার বাগরজা এলাকার জেলে ফিরোজ গাজীও একই কথা বলেন। তাঁর দাবি, নদীর অনেক জায়গায় চর জেগে ওঠায় স্রোত কমে গেছে। এতে আগের মতো ইলিশ আর এই অঞ্চলে ঢুকছে না।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষা না হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।
হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আলম জানান, এখন বেশিরভাগ ইলিশের ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের মধ্যে। একসময় যে এক থেকে দেড় কেজির বড় ইলিশ পাওয়া যেত, এখন তা খুবই কম দেখা যাচ্ছে।
বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, নদীতে অতিরিক্ত ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর মতে, বড় ইলিশ নদীতে ঢুকতে পারছে না, আবার ছোট ইলিশও সহজে সাগরে যেতে পারছে না। এতে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “ইলিশ খরস্রোতা নদীর মাছ। নদীতে স্রোত কমে গেলে বা চলাচলে বাধা তৈরি হলে এর প্রভাব উৎপাদনের ওপর পড়বেই।”
মৎস্য কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু আকার নয়, ইলিশের স্বাভাবিক রঙেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেভাবে উজ্জ্বল রুপালি আভা দেখা যেত, এখন অনেক মাছেই সেই উজ্জ্বলতা কমে গেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘ সময় নদীতে আটকে থাকা, স্বাভাবিক অভিবাসন ব্যাহত হওয়া এবং দূষণের প্রভাব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটছে। ছোট আকারের মাছ দ্রুত বাজারে চলে আসায় প্রজনন চক্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময় বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলে ১ হাজার ২৬৩টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বহু জেলেকে জরিমানা করা হয় এবং প্রায় ১৪ টন ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ২১৩টি।
তবে এত কড়াকড়ির পরও নদীতে মাছের সংকট কাটেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীর নাব্যতা, স্রোত ও পরিবেশগত ভারসাম্য ঠিক না থাকলে কেবল আইন প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, গত দুই বছর ধরেই ইলিশের আকার ছোট হচ্ছে। তাঁর মতে, ডুবোচর ও দূষণের কারণে ইলিশের মাইগ্রেশন বা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
নদীতে মাছ কম থাকায় বাজারেও ইলিশের সরবরাহ কমে গেছে। বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য মোকামে শুক্রবার ১০০ মণেরও কম ইলিশ এসেছে বলে জানিয়েছেন আড়তদার জহির সিকদার।
তিনি জানান, এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। ৬০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মাছ ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে।
ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রেতা লাল মিয়া বলেন, বাজারে ইলিশের চাহিদা আছে, কিন্তু সরবরাহ কম। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে জনপ্রিয় এই মাছ।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সাড়ে ৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বরিশাল জেলাতেই লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ হাজার টন।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। কারণ নদীতে মাছের উপস্থিতি কমে গেলে বাজারেও তার প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ শুধু অর্থনীতির নয়, বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও খাদ্য ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নদী রক্ষা, ড্রেজিং, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার নদীতে জাল ফেলছেন জেলেরা। কিন্তু মেঘনা ও কীর্তনখোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। জেলেদের দাবি, জালে উঠছে খুব কম মাছ, আর যেগুলো ধরা পড়ছে সেগুলোর বেশিরভাগই ছোট আকারের। মৎস্য কর্মকর্তারাও বলছেন, নদীতে ডুবোচর বেড়ে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে শুধু উৎপাদন নয়, মাছের আকার ও রঙেও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।
মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট, বরিশালের হিজলা ও মুলাদী সংলগ্ন মেঘনা নদী, তার শাখা নদী এবং কীর্তনখোলার বিস্তীর্ণ এলাকায় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। জাটকা সংরক্ষণে নেওয়া এই পদক্ষেপ শেষ হওয়ার পর নদীতে মাছের প্রাচুর্য ফিরবে—এমন প্রত্যাশা ছিল জেলে ও ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
নদীতে নেমে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় হতাশ জেলেরা। মেঘনাপাড়ের মেহেন্দীগঞ্জের জেলে তোফায়েল হোসেন বলেন, টানা দুই মাস নদীতে যেতে পারেননি। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নেমেও আশানুরূপ মাছ মিলছে না। তাঁর ভাষায়, “যা পাওয়া যায়, সেগুলোও ছোট। সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, অনেক জেলে দাদনের টাকায় চলেন। মাছ না মিললে সেই ঋণের চাপ আরও বাড়ে। নদীতে মাছের সংকটের কারণে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বরিশাল সদর উপজেলার বাগরজা এলাকার জেলে ফিরোজ গাজীও একই কথা বলেন। তাঁর দাবি, নদীর অনেক জায়গায় চর জেগে ওঠায় স্রোত কমে গেছে। এতে আগের মতো ইলিশ আর এই অঞ্চলে ঢুকছে না।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষা না হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।
হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আলম জানান, এখন বেশিরভাগ ইলিশের ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের মধ্যে। একসময় যে এক থেকে দেড় কেজির বড় ইলিশ পাওয়া যেত, এখন তা খুবই কম দেখা যাচ্ছে।
বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, নদীতে অতিরিক্ত ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর মতে, বড় ইলিশ নদীতে ঢুকতে পারছে না, আবার ছোট ইলিশও সহজে সাগরে যেতে পারছে না। এতে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “ইলিশ খরস্রোতা নদীর মাছ। নদীতে স্রোত কমে গেলে বা চলাচলে বাধা তৈরি হলে এর প্রভাব উৎপাদনের ওপর পড়বেই।”
মৎস্য কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু আকার নয়, ইলিশের স্বাভাবিক রঙেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেভাবে উজ্জ্বল রুপালি আভা দেখা যেত, এখন অনেক মাছেই সেই উজ্জ্বলতা কমে গেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘ সময় নদীতে আটকে থাকা, স্বাভাবিক অভিবাসন ব্যাহত হওয়া এবং দূষণের প্রভাব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটছে। ছোট আকারের মাছ দ্রুত বাজারে চলে আসায় প্রজনন চক্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময় বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলে ১ হাজার ২৬৩টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বহু জেলেকে জরিমানা করা হয় এবং প্রায় ১৪ টন ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ২১৩টি।
তবে এত কড়াকড়ির পরও নদীতে মাছের সংকট কাটেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীর নাব্যতা, স্রোত ও পরিবেশগত ভারসাম্য ঠিক না থাকলে কেবল আইন প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, গত দুই বছর ধরেই ইলিশের আকার ছোট হচ্ছে। তাঁর মতে, ডুবোচর ও দূষণের কারণে ইলিশের মাইগ্রেশন বা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
নদীতে মাছ কম থাকায় বাজারেও ইলিশের সরবরাহ কমে গেছে। বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য মোকামে শুক্রবার ১০০ মণেরও কম ইলিশ এসেছে বলে জানিয়েছেন আড়তদার জহির সিকদার।
তিনি জানান, এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। ৬০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মাছ ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে।
ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রেতা লাল মিয়া বলেন, বাজারে ইলিশের চাহিদা আছে, কিন্তু সরবরাহ কম। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে জনপ্রিয় এই মাছ।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সাড়ে ৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বরিশাল জেলাতেই লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ হাজার টন।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। কারণ নদীতে মাছের উপস্থিতি কমে গেলে বাজারেও তার প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ শুধু অর্থনীতির নয়, বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও খাদ্য ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নদী রক্ষা, ড্রেজিং, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

আপনার মতামত লিখুন