নওগাঁর মহাদেবপুরে ইটভাটার নির্গত ধোঁয়ায় একাধিক কৃষকের স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে। সবুজ ধানের ক্ষেত হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে যাওয়ায় হতাশা আর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, এক মৌসুমের শ্রম একদিনেই শেষ হয়ে গেছে।
মহাদেবপুর উপজেলার খাজুর ইউনিয়নের খাজুর বাজারের পেছনে অবস্থিত একটি ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কৃষকদের পক্ষ থেকে। ঘটনার পরপরই কৃষি বিভাগ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ শুরু করেছে এবং ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইটভাটা বন্ধ করার সময় হঠাৎ করে ঘন কালো ধোঁয়া বের হয়, যা বাতাসের সঙ্গে আশপাশের ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ধোঁয়ার প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই সবুজ ধানের গাছ বিবর্ণ হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ধান শুকিয়ে যায়।
একজন কৃষক বলেন, “সকালেও ক্ষেত সবুজ ছিল, বিকেলের মধ্যে সব পুড়ে যাওয়ার মতো হয়ে গেল। এমন ক্ষতি আমরা কখনো দেখিনি।”
আরেকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ধানের গাছে দানা আসার সময় ছিল। এই অবস্থায় ফসল নষ্ট হওয়ায় আমাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অধিকাংশই জানান, তাদের প্রধান আয়ের উৎস এই ধান চাষ। অনেকেই ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জমিতে চাষ করেছিলেন। হঠাৎ এমন ক্ষতির ফলে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
একজন কৃষক বলেন, “আমরা ঋণ করে বীজ, সার, কীটনাশক কিনেছি। এখন যদি ধান না পাই, তাহলে ঋণ শোধ করব কীভাবে?”
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো এলাকার কৃষি অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনার পর আজ দুপুর ১২টার পর কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। একটি টিম নিয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত জমি ঘুরে দেখেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ শুরু করেন।
কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিষয়ে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটার ধোঁয়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার পাশাপাশি ফসলের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। ধোঁয়ায় থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান গাছের পাতা ও দানার ক্ষতি করতে পারে, যার ফলে উৎপাদন কমে যায় বা পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
একজন স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞ বলেন, “ইটভাটার ধোঁয়া যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখা হয়, তাহলে আশপাশের কৃষিজমি নিয়মিত ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
একজন এলাকাবাসী বলেন, “আমরা চাই প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুক। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।”
তারা আরও দাবি করেন, ইটভাটার কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হোক এবং পরিবেশবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক।
ইটভাটা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—
এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কৃষি বিভাগের আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এমন ঘটনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
নওগাঁর মহাদেবপুরে ইটভাটার নির্গত ধোঁয়ায় একাধিক কৃষকের স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে। সবুজ ধানের ক্ষেত হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে যাওয়ায় হতাশা আর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, এক মৌসুমের শ্রম একদিনেই শেষ হয়ে গেছে।
মহাদেবপুর উপজেলার খাজুর ইউনিয়নের খাজুর বাজারের পেছনে অবস্থিত একটি ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কৃষকদের পক্ষ থেকে। ঘটনার পরপরই কৃষি বিভাগ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ শুরু করেছে এবং ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইটভাটা বন্ধ করার সময় হঠাৎ করে ঘন কালো ধোঁয়া বের হয়, যা বাতাসের সঙ্গে আশপাশের ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ধোঁয়ার প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই সবুজ ধানের গাছ বিবর্ণ হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ধান শুকিয়ে যায়।
একজন কৃষক বলেন, “সকালেও ক্ষেত সবুজ ছিল, বিকেলের মধ্যে সব পুড়ে যাওয়ার মতো হয়ে গেল। এমন ক্ষতি আমরা কখনো দেখিনি।”
আরেকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ধানের গাছে দানা আসার সময় ছিল। এই অবস্থায় ফসল নষ্ট হওয়ায় আমাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অধিকাংশই জানান, তাদের প্রধান আয়ের উৎস এই ধান চাষ। অনেকেই ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জমিতে চাষ করেছিলেন। হঠাৎ এমন ক্ষতির ফলে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
একজন কৃষক বলেন, “আমরা ঋণ করে বীজ, সার, কীটনাশক কিনেছি। এখন যদি ধান না পাই, তাহলে ঋণ শোধ করব কীভাবে?”
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো এলাকার কৃষি অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনার পর আজ দুপুর ১২টার পর কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। একটি টিম নিয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত জমি ঘুরে দেখেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ শুরু করেন।
কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিষয়ে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটার ধোঁয়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার পাশাপাশি ফসলের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। ধোঁয়ায় থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান গাছের পাতা ও দানার ক্ষতি করতে পারে, যার ফলে উৎপাদন কমে যায় বা পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
একজন স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞ বলেন, “ইটভাটার ধোঁয়া যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখা হয়, তাহলে আশপাশের কৃষিজমি নিয়মিত ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
একজন এলাকাবাসী বলেন, “আমরা চাই প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুক। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।”
তারা আরও দাবি করেন, ইটভাটার কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হোক এবং পরিবেশবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক।
ইটভাটা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—
এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কৃষি বিভাগের আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এমন ঘটনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন