হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে নেমে আসা বজ্রপাত আবারও কেড়ে নিল একাধিক প্রাণ। দেশের বিভিন্ন জেলায় একদিনেই ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন, যাদের অনেকেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে সুনামগঞ্জ, রংপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সুনামগঞ্জ জেলায়। জেলার জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও দিরাই উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের বেশিরভাগই হাওরে ধান কাটতে বা হাঁস চরাতে গিয়ে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান।
জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরে কাজ করার সময় বজ্রপাতে নূর জামাল নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তোফাজ্জল হোসেন আহত হন এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ধর্মপাশায় ধান কাটতে গিয়ে কলেজ শিক্ষার্থী হবিবুর রহমান গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
এছাড়া সরস্বতীপুর এলাকায় কিশোর রহমত উল্লাহ নিহত হয়েছে। তাহিরপুরে হাঁস চরাতে গিয়ে আবুল কালাম এবং দিরাই উপজেলার একটি হাওরে ধান কাটার সময় লিটন মিয়া বজ্রাঘাতে মারা যান।
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলায় মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে মিলন মিয়া ও আবু তালেব নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন। একই ঘটনায় এক শিশুসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
আহতদের কয়েকজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরে ধানক্ষেত দেখতে গিয়ে রহমত আলী উজ্জ্বল নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গফরগাঁওয়ে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যান মমতাজ আলী নামে এক বৃদ্ধ।
স্থানীয়দের মতে, হঠাৎ করে আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেননি।
নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার ধলার হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে আলতু মিয়া নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। প্রশাসন তার পরিবারের জন্য সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার বড় হাওরে কাজ করার সময় বজ্রপাতে হলুদ মিয়া নামে এক কৃষক ঘটনাস্থলেই মারা যান।
এদিকে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার একটি হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে সুনাম উদ্দিন নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্চ থেকে জুন—এই সময়টাতে কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। বিশেষ করে হাওর এলাকা ও খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
একজন আবহাওয়া বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বজ্রপাত শুরু হলে খোলা জায়গা, পানির ধারে বা উঁচু স্থানে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া জরুরি।”
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। বিভিন্ন এলাকায় তালগাছ রোপণসহ নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা বজ্রপাত প্রতিরোধে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে স্থানীয়দের মতে, অনেক ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা বা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব থাকায় মানুষ ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে বাধ্য হন।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বিস্তারিত কোনো কেন্দ্রীয় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসন নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্ষতিপূরণ নয়—গ্রামীণ এলাকায় বজ্রপাত সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি। মাঠপর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে এমন দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
একদিনে দেশের ছয় জেলায় ১২ জনের মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, বজ্রপাত এখন বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর হাওরাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি কমানো সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয় : বজ্রপাত মৃত্যু বাংলাদেশ আবহাওয়া

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে নেমে আসা বজ্রপাত আবারও কেড়ে নিল একাধিক প্রাণ। দেশের বিভিন্ন জেলায় একদিনেই ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন, যাদের অনেকেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে সুনামগঞ্জ, রংপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সুনামগঞ্জ জেলায়। জেলার জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও দিরাই উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের বেশিরভাগই হাওরে ধান কাটতে বা হাঁস চরাতে গিয়ে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান।
জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরে কাজ করার সময় বজ্রপাতে নূর জামাল নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তোফাজ্জল হোসেন আহত হন এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ধর্মপাশায় ধান কাটতে গিয়ে কলেজ শিক্ষার্থী হবিবুর রহমান গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
এছাড়া সরস্বতীপুর এলাকায় কিশোর রহমত উল্লাহ নিহত হয়েছে। তাহিরপুরে হাঁস চরাতে গিয়ে আবুল কালাম এবং দিরাই উপজেলার একটি হাওরে ধান কাটার সময় লিটন মিয়া বজ্রাঘাতে মারা যান।
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলায় মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে মিলন মিয়া ও আবু তালেব নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন। একই ঘটনায় এক শিশুসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
আহতদের কয়েকজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরে ধানক্ষেত দেখতে গিয়ে রহমত আলী উজ্জ্বল নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গফরগাঁওয়ে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যান মমতাজ আলী নামে এক বৃদ্ধ।
স্থানীয়দের মতে, হঠাৎ করে আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেননি।
নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার ধলার হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে আলতু মিয়া নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। প্রশাসন তার পরিবারের জন্য সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার বড় হাওরে কাজ করার সময় বজ্রপাতে হলুদ মিয়া নামে এক কৃষক ঘটনাস্থলেই মারা যান।
এদিকে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার একটি হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে সুনাম উদ্দিন নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্চ থেকে জুন—এই সময়টাতে কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। বিশেষ করে হাওর এলাকা ও খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
একজন আবহাওয়া বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বজ্রপাত শুরু হলে খোলা জায়গা, পানির ধারে বা উঁচু স্থানে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া জরুরি।”
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। বিভিন্ন এলাকায় তালগাছ রোপণসহ নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা বজ্রপাত প্রতিরোধে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে স্থানীয়দের মতে, অনেক ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা বা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব থাকায় মানুষ ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে বাধ্য হন।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বিস্তারিত কোনো কেন্দ্রীয় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসন নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্ষতিপূরণ নয়—গ্রামীণ এলাকায় বজ্রপাত সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি। মাঠপর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে এমন দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
একদিনে দেশের ছয় জেলায় ১২ জনের মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, বজ্রপাত এখন বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর হাওরাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি কমানো সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন