২০১৩ সালের ৫ মে রাত—রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর ঘিরে ঘটে যাওয়া সহিংসতার স্মৃতি এখনও অনেকের মনে তাজা। দীর্ঘ ১৩ বছর পর সেই আলোচিত ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন করে উঠে আসছে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নানা তথ্য, যা আবারও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শাপলা চত্বরে সংঘটিত ওই ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রোববার সকালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই ওই রাতে অন্তত ৩২ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তদন্ত এখনও চলমান থাকায় চূড়ান্ত সংখ্যা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০১৩ সালে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবিতে ঢাকার মতিঝিলে শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। দিনভর উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও সহিংসতার পর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে এলাকা খালি করা হয়।
সেই রাতের অভিযানে কী ঘটেছিল, ঠিক কতজন হতাহত হয়েছিল—এসব নিয়ে শুরু থেকেই নানা ধরনের দাবি, পাল্টা দাবি ও বিতর্ক চলে আসছে। বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি।
ঘটনাস্থলের আশপাশে বসবাসকারী কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ওই রাতে তারা ব্যাপক আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “রাতের দিকে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আমরা দোকানপাট বন্ধ করে আশ্রয় নিই। কী ঘটছিল, পুরোটা পরিষ্কার বোঝা যায়নি, তবে গোলমাল আর আতঙ্ক ছিল স্পষ্ট।”
আরেকজন বাসিন্দা বলেন, “সেই রাতের পর কয়েকদিন এলাকা প্রায় অচল হয়ে যায়। মানুষজন ভয়ে বাইরে বের হতে চায়নি। এখনো সেই স্মৃতি অনেকের মনে আছে।”
শাপলা চত্বরের ঘটনার পর থেকেই নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক দেখা যায়। কেউ কেউ বেশি সংখ্যক প্রাণহানির দাবি করলেও, সরকারি বিভিন্ন সূত্রে তুলনামূলক কম সংখ্যার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান তদন্তে ৩২ জন নিহতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হলেও, এটি চূড়ান্ত নয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বছর পর তদন্ত শেষ হওয়ার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দেরির কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং প্রমাণ যাচাইয়ের মতো জটিল প্রক্রিয়ার কারণে তদন্তে সময় লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর একটি ঘটনা হওয়ায় শুরু থেকেই এটি সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে প্রতিটি তথ্য যাচাইয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের চেষ্টা করা হয়েছে। তারা আশা করছেন, তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং জনগণ প্রকৃত তথ্য জানতে পারবে।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু তদন্ত শেষ করাই যথেষ্ট নয়—প্রয়োজনে দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঘটনাটি নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিহতের সংখ্যা এবং ঘটনার প্রকৃত বিবরণ সামনে এলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক বা বিশ্লেষণ শুরু হতে পারে।
শাপলা চত্বরের সেই রাত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়। বহু বছর পর তদন্ত শেষের পথে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখন সবার দৃষ্টি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে—যেখানে হয়তো জানা যাবে সেই রাতের প্রকৃত ঘটনা, হতাহতের নির্ভুল সংখ্যা এবং পুরো ঘটনার বাস্তব চিত্র।
বিষয় : শাপলা চত্বর ২০১৩

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬
২০১৩ সালের ৫ মে রাত—রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর ঘিরে ঘটে যাওয়া সহিংসতার স্মৃতি এখনও অনেকের মনে তাজা। দীর্ঘ ১৩ বছর পর সেই আলোচিত ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন করে উঠে আসছে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নানা তথ্য, যা আবারও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শাপলা চত্বরে সংঘটিত ওই ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রোববার সকালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই ওই রাতে অন্তত ৩২ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তদন্ত এখনও চলমান থাকায় চূড়ান্ত সংখ্যা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০১৩ সালে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবিতে ঢাকার মতিঝিলে শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। দিনভর উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও সহিংসতার পর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে এলাকা খালি করা হয়।
সেই রাতের অভিযানে কী ঘটেছিল, ঠিক কতজন হতাহত হয়েছিল—এসব নিয়ে শুরু থেকেই নানা ধরনের দাবি, পাল্টা দাবি ও বিতর্ক চলে আসছে। বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি।
ঘটনাস্থলের আশপাশে বসবাসকারী কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ওই রাতে তারা ব্যাপক আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “রাতের দিকে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আমরা দোকানপাট বন্ধ করে আশ্রয় নিই। কী ঘটছিল, পুরোটা পরিষ্কার বোঝা যায়নি, তবে গোলমাল আর আতঙ্ক ছিল স্পষ্ট।”
আরেকজন বাসিন্দা বলেন, “সেই রাতের পর কয়েকদিন এলাকা প্রায় অচল হয়ে যায়। মানুষজন ভয়ে বাইরে বের হতে চায়নি। এখনো সেই স্মৃতি অনেকের মনে আছে।”
শাপলা চত্বরের ঘটনার পর থেকেই নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক দেখা যায়। কেউ কেউ বেশি সংখ্যক প্রাণহানির দাবি করলেও, সরকারি বিভিন্ন সূত্রে তুলনামূলক কম সংখ্যার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান তদন্তে ৩২ জন নিহতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হলেও, এটি চূড়ান্ত নয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বছর পর তদন্ত শেষ হওয়ার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দেরির কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং প্রমাণ যাচাইয়ের মতো জটিল প্রক্রিয়ার কারণে তদন্তে সময় লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর একটি ঘটনা হওয়ায় শুরু থেকেই এটি সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে প্রতিটি তথ্য যাচাইয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের চেষ্টা করা হয়েছে। তারা আশা করছেন, তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং জনগণ প্রকৃত তথ্য জানতে পারবে।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু তদন্ত শেষ করাই যথেষ্ট নয়—প্রয়োজনে দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঘটনাটি নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিহতের সংখ্যা এবং ঘটনার প্রকৃত বিবরণ সামনে এলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক বা বিশ্লেষণ শুরু হতে পারে।
শাপলা চত্বরের সেই রাত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়। বহু বছর পর তদন্ত শেষের পথে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখন সবার দৃষ্টি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে—যেখানে হয়তো জানা যাবে সেই রাতের প্রকৃত ঘটনা, হতাহতের নির্ভুল সংখ্যা এবং পুরো ঘটনার বাস্তব চিত্র।

আপনার মতামত লিখুন