ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ করা হচ্ছে, আর সেই নতুন ফরম্যাটেই অনুষ্ঠিত হবে ২০৩৪ বিশ্বকাপও। ফলে আগামী আসরটি হবে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড়, দীর্ঘ এবং আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
এই বিশাল আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ না থাকায় এককভাবেই ২০৩৪ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিশ্চিত করেছে তারা। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে এটি হবে দ্বিতীয় কোনো আরব দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের ঘটনা।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০৩৪ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে মোট পাঁচটি শহরে। এসব শহরে থাকবে ১৫টি স্টেডিয়াম, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটটি স্টেডিয়াম থাকবে রাজধানী রিয়াদে।
প্রস্তাবিত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে রিয়াদ, জেদ্দা, আল খোবার, আবহা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পিত স্মার্ট সিটি নিওম। বিশ্বকাপকে ঘিরে এসব শহরে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ নজর কেড়েছে ‘কিং সালমান স্টেডিয়াম’। রিয়াদে নির্মাণাধীন এই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৯২ হাজার দর্শক। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানেই অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ও ফাইনাল ম্যাচ।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ফুটবল নয়, বিশ্বকে নিজেদের আধুনিক নগর পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও দেখাতে চায় সৌদি আরব।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাধুলায় ব্যাপক বিনিয়োগ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরব। বিশেষ করে ফুটবলে তাদের আগ্রাসী বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ (PIF)-এর মাধ্যমে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো থেকে একের পর এক তারকা ফুটবলারকে সৌদি লিগে আনা হয়েছে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র, করিম বেনজেমা, সাদিও মানে ও এন’গোলো কান্তের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলাররা বর্তমানে সৌদি ক্লাবগুলোতে খেলছেন। এতে সৌদি প্রো লিগের জনপ্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রেও দেশটির সক্ষমতার বার্তা আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজন শুধু ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ।
দেশটির “ভিশন ২০৩০” কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও খেলাধুলাকে অর্থনীতির বড় খাতে পরিণত করা।
বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে চায় দেশটি। একই সঙ্গে পর্যটন শিল্প, অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগও দেখছে সৌদি সরকার।
তবে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন অতীতে সৌদি আরবের সমালোচনা করেছে। সমালোচকদের দাবি, বড় বড় ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে দেশটি নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা করছে। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
ফিফার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা এবং আয়োজক কাঠামো আগের চেয়ে অনেক বড় হবে। এর ফলে আরও বেশি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ফুটবল আরও বৈশ্বিক হবে এবং ছোট দলগুলোর জন্যও বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘ টুর্নামেন্ট, খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত চাপ এবং ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা চলছে।
ফিফা বলছে, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত স্টেডিয়াম ও সম্প্রচার ব্যবস্থার কারণে বড় ফরম্যাট পরিচালনা এখন অনেক সহজ।
২০২২ সালে কাতার প্রথম আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইতিহাস গড়ে। সেই টুর্নামেন্টে আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
এবার সেই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। অনেকের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ফুটবলের প্রভাব আরও বাড়াবে এবং নতুন প্রজন্মকে ফুটবলের দিকে আকৃষ্ট করবে।
সব মিলিয়ে, ২০৩৪ ফুটবল বিশ্বকাপকে শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক কৌশল ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের বড় মঞ্চ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি আরব তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফুটবল বিশ্বকে কতটা চমকে দিতে পারে।

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৪
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ করা হচ্ছে, আর সেই নতুন ফরম্যাটেই অনুষ্ঠিত হবে ২০৩৪ বিশ্বকাপও। ফলে আগামী আসরটি হবে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড়, দীর্ঘ এবং আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
এই বিশাল আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ না থাকায় এককভাবেই ২০৩৪ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিশ্চিত করেছে তারা। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে এটি হবে দ্বিতীয় কোনো আরব দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের ঘটনা।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০৩৪ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে মোট পাঁচটি শহরে। এসব শহরে থাকবে ১৫টি স্টেডিয়াম, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটটি স্টেডিয়াম থাকবে রাজধানী রিয়াদে।
প্রস্তাবিত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে রিয়াদ, জেদ্দা, আল খোবার, আবহা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পিত স্মার্ট সিটি নিওম। বিশ্বকাপকে ঘিরে এসব শহরে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ নজর কেড়েছে ‘কিং সালমান স্টেডিয়াম’। রিয়াদে নির্মাণাধীন এই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৯২ হাজার দর্শক। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানেই অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ও ফাইনাল ম্যাচ।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ফুটবল নয়, বিশ্বকে নিজেদের আধুনিক নগর পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও দেখাতে চায় সৌদি আরব।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাধুলায় ব্যাপক বিনিয়োগ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরব। বিশেষ করে ফুটবলে তাদের আগ্রাসী বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ (PIF)-এর মাধ্যমে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো থেকে একের পর এক তারকা ফুটবলারকে সৌদি লিগে আনা হয়েছে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র, করিম বেনজেমা, সাদিও মানে ও এন’গোলো কান্তের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলাররা বর্তমানে সৌদি ক্লাবগুলোতে খেলছেন। এতে সৌদি প্রো লিগের জনপ্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রেও দেশটির সক্ষমতার বার্তা আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজন শুধু ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ।
দেশটির “ভিশন ২০৩০” কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও খেলাধুলাকে অর্থনীতির বড় খাতে পরিণত করা।
বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে চায় দেশটি। একই সঙ্গে পর্যটন শিল্প, অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগও দেখছে সৌদি সরকার।
তবে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন অতীতে সৌদি আরবের সমালোচনা করেছে। সমালোচকদের দাবি, বড় বড় ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে দেশটি নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা করছে। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
ফিফার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা এবং আয়োজক কাঠামো আগের চেয়ে অনেক বড় হবে। এর ফলে আরও বেশি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ফুটবল আরও বৈশ্বিক হবে এবং ছোট দলগুলোর জন্যও বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘ টুর্নামেন্ট, খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত চাপ এবং ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা চলছে।
ফিফা বলছে, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত স্টেডিয়াম ও সম্প্রচার ব্যবস্থার কারণে বড় ফরম্যাট পরিচালনা এখন অনেক সহজ।
২০২২ সালে কাতার প্রথম আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইতিহাস গড়ে। সেই টুর্নামেন্টে আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
এবার সেই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। অনেকের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ফুটবলের প্রভাব আরও বাড়াবে এবং নতুন প্রজন্মকে ফুটবলের দিকে আকৃষ্ট করবে।
সব মিলিয়ে, ২০৩৪ ফুটবল বিশ্বকাপকে শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক কৌশল ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের বড় মঞ্চ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি আরব তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফুটবল বিশ্বকে কতটা চমকে দিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন