দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৩–৪টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৩–৪টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা

৬৭৮ কোটি টাকার স্বর্ণ-হীরা চোরাচালান মামলা: দিলীপ আগরওয়ালার ৩ দিনের রিমান্ড আবেদন

‘সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ব’—রংপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, রায়ের কপি চেয়েছে ঢাকা

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত এ মাসেই, ২০২৭ সালের মধ্যে ১০ দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ৫ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ

স্থাপনা নির্মাণে প্রকৃতি সংরক্ষণের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জাপানে কাজের নতুন সুযোগ বাংলাদেশিদের, নিয়োগ শুরু ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৩–৪টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৩–৪টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ ও দেশীয় বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়ে আটটির মতো সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আলোচনাধীন খসড়াগুলোর মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালে সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর টোকিও সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তাঁর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল জাপানে যাবে।

প্রতিনিধিদলে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি, বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা থাকবেন।

বাংলাদেশ ও জাপান সরকার মঙ্গলবার একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে।

২৭ অক্টোবর দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো অগ্রাধিকার

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, সফরে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হবে।

বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক আলোচনায় থাকবে।

মেট্রো রেল ও মাতারবাড়ী প্রকল্প আলোচনায়

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে মেট্রো রেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে।

সফরে এসব প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন, চলমান কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রসচিব।

মেট্রো রেল লাইন-১ ও লাইন-৫-এর ব্যয় যথাক্রমে ৮৩ শতাংশ ও ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচিত হবে।

জাপানের ঋণের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। পররাষ্ট্রসচিব বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের কাছ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। তবে ঋণের সুদের হার সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে আলোচনার ফল পরে জানানো হবে।

জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠকের সম্ভাব্য কর্মসূচি রয়েছে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। সফরসূচিতে চিবা শহরের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, নিউক্লিয়ার হেডকোয়ার্টার্স এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কথাও রয়েছে।

ইপিএ কার্যকর হলে খাতভিত্তিক প্রভাব পর্যালোচনা

ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে জাপানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। সেই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

তিনি বলেন, ইপিএ একটি সামগ্রিক চুক্তি। কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধা তৈরি হলে অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে পাওয়া সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর কোন খাত কী ধরনের সমস্যায় পড়ছে, তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে।

সামগ্রিকভাবে দুই দেশই এ চুক্তি থেকে উপকৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষতা উন্নয়নেও সহযোগিতা

সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দেশীয় বিমান পরিবহন নিয়েও সমঝোতার খসড়া আলোচনায় রয়েছে। আটটির মতো খসড়ার মধ্যে কয়েকটি সফরকালে চূড়ান্ত করে সই করার আশা করছে বাংলাদেশ।

মাতারবাড়ী বন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগ

মাতারবাড়ী বন্দরের উন্নয়ন এবং এর মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ সামাল দেওয়ার মতো কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা বন্দরে থাকা প্রয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই মাতারবাড়ী বন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যতে বন্দরের সক্ষমতার ঘাটতি বা অতিরিক্ত অব্যবহৃত সক্ষমতা দেখা দিলে সে অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত অবসানে যৌথ ভূমিকা।

পররাষ্ট্রসচিব আশা প্রকাশ করেন, সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে, নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে এবং জাপান থেকে বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি বা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ ধরনের বিবৃতি নিয়ে সফরের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা ও দর-কষাকষি চলতে পারে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সফরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

বিষয় : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফর বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক সমঝোতা স্মারক জাপান সফর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬


প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৩–৪টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা

প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ ও দেশীয় বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়ে আটটির মতো সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আলোচনাধীন খসড়াগুলোর মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালে সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর টোকিও সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তাঁর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল জাপানে যাবে।

প্রতিনিধিদলে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি, বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা থাকবেন।

বাংলাদেশ ও জাপান সরকার মঙ্গলবার একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে।

২৭ অক্টোবর দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো অগ্রাধিকার

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, সফরে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হবে।

বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক আলোচনায় থাকবে।

মেট্রো রেল ও মাতারবাড়ী প্রকল্প আলোচনায়

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে মেট্রো রেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে।

সফরে এসব প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন, চলমান কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রসচিব।

মেট্রো রেল লাইন-১ ও লাইন-৫-এর ব্যয় যথাক্রমে ৮৩ শতাংশ ও ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচিত হবে।

জাপানের ঋণের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। পররাষ্ট্রসচিব বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের কাছ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। তবে ঋণের সুদের হার সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে আলোচনার ফল পরে জানানো হবে।

জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠকের সম্ভাব্য কর্মসূচি রয়েছে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। সফরসূচিতে চিবা শহরের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, নিউক্লিয়ার হেডকোয়ার্টার্স এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কথাও রয়েছে।

ইপিএ কার্যকর হলে খাতভিত্তিক প্রভাব পর্যালোচনা

ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে জাপানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। সেই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

তিনি বলেন, ইপিএ একটি সামগ্রিক চুক্তি। কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধা তৈরি হলে অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে পাওয়া সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর কোন খাত কী ধরনের সমস্যায় পড়ছে, তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে।

সামগ্রিকভাবে দুই দেশই এ চুক্তি থেকে উপকৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষতা উন্নয়নেও সহযোগিতা

সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দেশীয় বিমান পরিবহন নিয়েও সমঝোতার খসড়া আলোচনায় রয়েছে। আটটির মতো খসড়ার মধ্যে কয়েকটি সফরকালে চূড়ান্ত করে সই করার আশা করছে বাংলাদেশ।

মাতারবাড়ী বন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগ

মাতারবাড়ী বন্দরের উন্নয়ন এবং এর মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ সামাল দেওয়ার মতো কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা বন্দরে থাকা প্রয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই মাতারবাড়ী বন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যতে বন্দরের সক্ষমতার ঘাটতি বা অতিরিক্ত অব্যবহৃত সক্ষমতা দেখা দিলে সে অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত অবসানে যৌথ ভূমিকা।

পররাষ্ট্রসচিব আশা প্রকাশ করেন, সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে, নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে এবং জাপান থেকে বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি বা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ ধরনের বিবৃতি নিয়ে সফরের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা ও দর-কষাকষি চলতে পারে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সফরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হবে।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর