মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার মাঝেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের কৌশলগত রিজার্ভে ৩ কোটি ব্যারেল তেল সংরক্ষণ এবং ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
শুক্রবার সংক্ষিপ্ত সফরে আবুধাবি পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরটি এমন এক সময়ে হলো, যখন কয়েক দিন আগেই ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে এই সফরকে কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দুই দেশের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল জ্বালানি সহযোগিতা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডনক) এবং ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেডের মধ্যে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় ভারতের কৌশলগত রিজার্ভে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল সংরক্ষণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৩ কোটি ব্যারেলে নেওয়া হবে।
এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতে কৌশলগত গ্যাস রিজার্ভ তৈরির বিষয়েও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। এলপিজি সরবরাহ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছেছে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন এবং এডনক।
ভারতের জন্য এই চুক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বা সরবরাহ ব্যাহত হলে কৌশলগত মজুত দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভারত আগেভাগেই নিজেদের নিরাপত্তা বলয় আরও শক্ত করতে চাইছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন নরেন্দ্র মোদি।
ভারতের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিকে “মুক্ত, নিরাপদ ও উন্মুক্ত” রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক হামলার তীব্র সমালোচনা করে মোদি বলেন, বেসামরিক স্থাপনা বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো “অনভিপ্রেত”।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, আলোচনায় আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপদ নৌ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন।
আবুধাবি বিমানবন্দরে মোদিকে স্বাগত জানান আমিরাতের প্রেসিডেন্ট নিজেই। সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর বহনকারী বিমানকে যুদ্ধবিমান দিয়ে এসকর্ট করাও নজর কাড়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি পরে আমিরাত সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখেন, দেশটিতে বসবাসরত ভারতীয়দের পরিবারের সদস্যের মতো দেখভাল করা হচ্ছে।
সফরের আরেকটি বড় দিক ছিল বিনিয়োগ চুক্তি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের বিভিন্ন খাতে মোট ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জানা গেছে, এই অর্থ তিনটি বড় খাতে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি এবং ভারতের ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড যৌথভাবে ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে।
এ ছাড়া এমিরেটস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ভারতের আরবিএল ব্যাংকে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানি ভারতের সম্মান ক্যাপিটালে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে ঘোষণা এসেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলছে, এই বিনিয়োগগুলো ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর আমিরাতের আস্থার প্রতিফলন।
অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতকে একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বিশেষ করে অবকাঠামো, ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতে ভারত এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
শুধু অর্থনীতি নয়, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও সম্পর্ক গভীর করতে চাইছে দুই দেশ। সফরের সময় “কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের রূপরেখা” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়েছে।
চুক্তির আওতায় যৌথ মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও দুই দেশ নতুন সুযোগ খুঁজবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এই চুক্তিকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে ভারত এখন শুধু জ্বালানি নয়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বেও গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
সফরে প্রবাসী ভারতীয়দের প্রসঙ্গও উঠে আসে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক কাজ করছেন। দেশটির অর্থনীতি ও বিভিন্ন সেবা খাতে তাঁদের বড় ভূমিকা রয়েছে।
মোদি তাঁর বক্তব্যে প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা ও কল্যাণে আমিরাত সরকারের সহযোগিতার প্রশংসা করেন। অন্যদিকে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু অর্থনীতি বা কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের মধ্যকার বন্ধনও এই সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে।
মোদি এই সফরে যাওয়ার আগের দিন দিল্লিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরই আবুধাবি সফরকে অনেকেই কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ হিসেবে দেখছেন।
একদিকে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, অন্যদিকে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা—ভারত যেন দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে জ্বালানি, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ—এই তিন ক্ষেত্র এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে, আবুধাবিতে হওয়া এই বৈঠক ভারত-আমিরাত সম্পর্ককে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জ্বালানি মজুত, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে দুই দেশ ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাইছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কী দিকে যায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার কতটা স্থিতিশীল থাকে, তার ওপর এই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

রোববার, ১৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার মাঝেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের কৌশলগত রিজার্ভে ৩ কোটি ব্যারেল তেল সংরক্ষণ এবং ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
শুক্রবার সংক্ষিপ্ত সফরে আবুধাবি পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরটি এমন এক সময়ে হলো, যখন কয়েক দিন আগেই ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে এই সফরকে কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দুই দেশের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল জ্বালানি সহযোগিতা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডনক) এবং ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেডের মধ্যে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় ভারতের কৌশলগত রিজার্ভে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল সংরক্ষণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৩ কোটি ব্যারেলে নেওয়া হবে।
এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতে কৌশলগত গ্যাস রিজার্ভ তৈরির বিষয়েও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। এলপিজি সরবরাহ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছেছে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন এবং এডনক।
ভারতের জন্য এই চুক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বা সরবরাহ ব্যাহত হলে কৌশলগত মজুত দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভারত আগেভাগেই নিজেদের নিরাপত্তা বলয় আরও শক্ত করতে চাইছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন নরেন্দ্র মোদি।
ভারতের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিকে “মুক্ত, নিরাপদ ও উন্মুক্ত” রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক হামলার তীব্র সমালোচনা করে মোদি বলেন, বেসামরিক স্থাপনা বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো “অনভিপ্রেত”।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, আলোচনায় আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপদ নৌ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন।
আবুধাবি বিমানবন্দরে মোদিকে স্বাগত জানান আমিরাতের প্রেসিডেন্ট নিজেই। সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর বহনকারী বিমানকে যুদ্ধবিমান দিয়ে এসকর্ট করাও নজর কাড়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি পরে আমিরাত সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখেন, দেশটিতে বসবাসরত ভারতীয়দের পরিবারের সদস্যের মতো দেখভাল করা হচ্ছে।
সফরের আরেকটি বড় দিক ছিল বিনিয়োগ চুক্তি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের বিভিন্ন খাতে মোট ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জানা গেছে, এই অর্থ তিনটি বড় খাতে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি এবং ভারতের ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড যৌথভাবে ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে।
এ ছাড়া এমিরেটস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ভারতের আরবিএল ব্যাংকে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানি ভারতের সম্মান ক্যাপিটালে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে ঘোষণা এসেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলছে, এই বিনিয়োগগুলো ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর আমিরাতের আস্থার প্রতিফলন।
অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতকে একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বিশেষ করে অবকাঠামো, ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতে ভারত এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
শুধু অর্থনীতি নয়, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও সম্পর্ক গভীর করতে চাইছে দুই দেশ। সফরের সময় “কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের রূপরেখা” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়েছে।
চুক্তির আওতায় যৌথ মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও দুই দেশ নতুন সুযোগ খুঁজবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এই চুক্তিকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে ভারত এখন শুধু জ্বালানি নয়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বেও গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
সফরে প্রবাসী ভারতীয়দের প্রসঙ্গও উঠে আসে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক কাজ করছেন। দেশটির অর্থনীতি ও বিভিন্ন সেবা খাতে তাঁদের বড় ভূমিকা রয়েছে।
মোদি তাঁর বক্তব্যে প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা ও কল্যাণে আমিরাত সরকারের সহযোগিতার প্রশংসা করেন। অন্যদিকে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু অর্থনীতি বা কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের মধ্যকার বন্ধনও এই সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে।
মোদি এই সফরে যাওয়ার আগের দিন দিল্লিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরই আবুধাবি সফরকে অনেকেই কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ হিসেবে দেখছেন।
একদিকে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, অন্যদিকে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা—ভারত যেন দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে জ্বালানি, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ—এই তিন ক্ষেত্র এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে, আবুধাবিতে হওয়া এই বৈঠক ভারত-আমিরাত সম্পর্ককে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জ্বালানি মজুত, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে দুই দেশ ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাইছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কী দিকে যায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার কতটা স্থিতিশীল থাকে, তার ওপর এই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

আপনার মতামত লিখুন