গাজীপুরে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একই পরিবারের পাঁচজনসহ একাধিক নৃশংস হত্যার ঘটনায় স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কোথাও গলা কেটে, কোথাও পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় আর অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।
গত কয়েক দিনের ব্যবধানে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব ঘটনায় অন্তত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আছেন অটোরিকশাচালক, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে একটি পরিবারের একাধিক সদস্যও।
স্থানীয়রা বলছেন, এত অল্প সময়ে এতগুলো হত্যাকাণ্ড এর আগে এলাকায় খুব কমই দেখা গেছে। প্রতিদিন নতুন কোনো ঘটনার খবর আসছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের ভয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে ৮ মে দিবাগত রাতে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে। সেখানে একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন শারমিন খানম (৩৫), তাঁর তিন কন্যা মিম (১৬), মারিয়া (৮), ফারিয়া (২) এবং তাঁর ছোট ভাই রসুল মোল্লা (২২)। ঘটনার পর থেকেই শারমিনের স্বামী ফোরকান পলাতক বলে জানা গেছে এবং তাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়রা বলছেন, এমন নৃশংসতা কল্পনাও করা যায় না।
পরদিন ৯ মে সন্ধ্যায় প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান বাজারে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে এক বৃদ্ধকে সালিসে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত ব্যক্তি ছিলেন জয়নাল আবেদীন (ষাটোর্ধ্ব), স্থানীয় বিএনপির সাবেক নেতা। এ ঘটনায় এলাকায় বিতর্ক ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এরপর ১০ মে কালিয়াকৈরের ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময় তাদের ব্যবহৃত ট্রাকটিও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং কয়েকশ জনকে আসামি করে তদন্ত চলছে।
গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ওঝারপাড়া এলাকায় ১২ মে শুভ নামের এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। নিহত শুভ ছিলেন নেত্রকোনা জেলার বাসিন্দা এবং গাজীপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
এরপরই রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গ্রামের গজারিবনের ভেতর থেকে আরেক অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সী ছিলেন।
এভাবে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা সন্তানদের বাইরে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন।
একজন অভিভাবক বলেন, “সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হয়, আজ আবার কী খবর শুনতে হবে। সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় বুক কেঁপে ওঠে।”
আরেকজন দোকানদার জানান, সন্ধ্যার পর বাজারে মানুষের চলাচল কমে গেছে। অনেকেই আগে ঘরে ফিরছেন।
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের শিক্ষক মনিরুল কবির মনে করেন, সমাজে আইনের প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং সহনশীলতার অভাব এই ধরনের সহিংসতার পেছনে বড় কারণ।
তার মতে, “মানুষ এখন দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাচ্ছে। বিচার বা আইন হাতে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পরিবার ও শিক্ষায় নৈতিকতার চর্চা কমে গেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।”
অন্যদিকে, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অসীম বিভাকর বলেন, সমাজে নৈতিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি ও মানসিক অস্থিরতাও সহিংসতা বাড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
গাজীপুর পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ড গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাদকের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তার ভাষায়, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে, কিন্তু সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানেরা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এটা নজরদারির বাইরে রাখা যাবে না।”
তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই এসব ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এক সপ্তাহে একাধিক হত্যাকাণ্ড শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। গাজীপুরের মতো শিল্পনগরীতে শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মপরিবেশ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিবারিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও ভয় তৈরি হলে সমাজে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে।
গাজীপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড এখন শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসন তদন্তের কথা বললেও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দিন দিন বাড়ছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সহিংসতার চক্র ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ কত দ্রুত নেওয়া হবে, এবং সাধারণ মানুষ আবার কখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
গাজীপুরে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একই পরিবারের পাঁচজনসহ একাধিক নৃশংস হত্যার ঘটনায় স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কোথাও গলা কেটে, কোথাও পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় আর অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।
গত কয়েক দিনের ব্যবধানে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব ঘটনায় অন্তত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আছেন অটোরিকশাচালক, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে একটি পরিবারের একাধিক সদস্যও।
স্থানীয়রা বলছেন, এত অল্প সময়ে এতগুলো হত্যাকাণ্ড এর আগে এলাকায় খুব কমই দেখা গেছে। প্রতিদিন নতুন কোনো ঘটনার খবর আসছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের ভয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে ৮ মে দিবাগত রাতে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে। সেখানে একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন শারমিন খানম (৩৫), তাঁর তিন কন্যা মিম (১৬), মারিয়া (৮), ফারিয়া (২) এবং তাঁর ছোট ভাই রসুল মোল্লা (২২)। ঘটনার পর থেকেই শারমিনের স্বামী ফোরকান পলাতক বলে জানা গেছে এবং তাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়রা বলছেন, এমন নৃশংসতা কল্পনাও করা যায় না।
পরদিন ৯ মে সন্ধ্যায় প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান বাজারে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে এক বৃদ্ধকে সালিসে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত ব্যক্তি ছিলেন জয়নাল আবেদীন (ষাটোর্ধ্ব), স্থানীয় বিএনপির সাবেক নেতা। এ ঘটনায় এলাকায় বিতর্ক ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এরপর ১০ মে কালিয়াকৈরের ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময় তাদের ব্যবহৃত ট্রাকটিও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং কয়েকশ জনকে আসামি করে তদন্ত চলছে।
গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ওঝারপাড়া এলাকায় ১২ মে শুভ নামের এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। নিহত শুভ ছিলেন নেত্রকোনা জেলার বাসিন্দা এবং গাজীপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
এরপরই রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গ্রামের গজারিবনের ভেতর থেকে আরেক অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সী ছিলেন।
এভাবে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা সন্তানদের বাইরে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন।
একজন অভিভাবক বলেন, “সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হয়, আজ আবার কী খবর শুনতে হবে। সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় বুক কেঁপে ওঠে।”
আরেকজন দোকানদার জানান, সন্ধ্যার পর বাজারে মানুষের চলাচল কমে গেছে। অনেকেই আগে ঘরে ফিরছেন।
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের শিক্ষক মনিরুল কবির মনে করেন, সমাজে আইনের প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং সহনশীলতার অভাব এই ধরনের সহিংসতার পেছনে বড় কারণ।
তার মতে, “মানুষ এখন দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাচ্ছে। বিচার বা আইন হাতে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পরিবার ও শিক্ষায় নৈতিকতার চর্চা কমে গেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।”
অন্যদিকে, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অসীম বিভাকর বলেন, সমাজে নৈতিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি ও মানসিক অস্থিরতাও সহিংসতা বাড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
গাজীপুর পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ড গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাদকের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তার ভাষায়, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে, কিন্তু সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানেরা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এটা নজরদারির বাইরে রাখা যাবে না।”
তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই এসব ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এক সপ্তাহে একাধিক হত্যাকাণ্ড শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। গাজীপুরের মতো শিল্পনগরীতে শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মপরিবেশ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিবারিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও ভয় তৈরি হলে সমাজে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে।
গাজীপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড এখন শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসন তদন্তের কথা বললেও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দিন দিন বাড়ছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সহিংসতার চক্র ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ কত দ্রুত নেওয়া হবে, এবং সাধারণ মানুষ আবার কখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

আপনার মতামত লিখুন