দেশজুড়ে আবারও আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে হাম। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩১ জনে।
একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে মারা গেছে ৪৯ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সংক্রমণের প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৭০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ১১৫ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপও বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২৬ হাজার ১০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২২ হাজার ৬৫০ জন। তবে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসছেন, যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।”
এক অভিভাবক জানান, “আমার ছেলের জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখে প্রথমে সাধারণ সমস্যা ভেবেছিলাম। পরে অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখন বুঝতে পারছি, শুরুতেই সচেতন হওয়া দরকার ছিল।”
এ ধরনের অভিজ্ঞতা এখন অনেক পরিবারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, যা সচেতনতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, কিছু এলাকায় টিকার প্রতি অনীহা, এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেওয়া।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। নিয়মিত টিকা নিলে এটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু টিকাদানে ঘাটতি থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।”
এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, যা শহরাঞ্চলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে পরিস্থিতি মোকাবেলায় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, কিছু এলাকায় এখনো টিকাদান কার্যক্রম যথেষ্ট জোরদার হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়—সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
হামের এই বাড়তি সংক্রমণ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ায় চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে হামের জটিলতা আরও মারাত্মক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। অভিভাবকদের মধ্যে টিকা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা এবং প্রাথমিক উপসর্গ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই সংক্রমণ আরও বড় আকার নিতে পারে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। সময়মতো টিকা গ্রহণ ও সচেতন আচরণই পারে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে। এখনই সতর্ক না হলে, এর মূল্য দিতে হতে পারে আরও বেশি প্রাণহানির মাধ্যমে।

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬
দেশজুড়ে আবারও আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে হাম। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩১ জনে।
একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে মারা গেছে ৪৯ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সংক্রমণের প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৭০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ১১৫ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপও বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২৬ হাজার ১০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২২ হাজার ৬৫০ জন। তবে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসছেন, যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।”
এক অভিভাবক জানান, “আমার ছেলের জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখে প্রথমে সাধারণ সমস্যা ভেবেছিলাম। পরে অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখন বুঝতে পারছি, শুরুতেই সচেতন হওয়া দরকার ছিল।”
এ ধরনের অভিজ্ঞতা এখন অনেক পরিবারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, যা সচেতনতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, কিছু এলাকায় টিকার প্রতি অনীহা, এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেওয়া।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। নিয়মিত টিকা নিলে এটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু টিকাদানে ঘাটতি থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।”
এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, যা শহরাঞ্চলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে পরিস্থিতি মোকাবেলায় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, কিছু এলাকায় এখনো টিকাদান কার্যক্রম যথেষ্ট জোরদার হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়—সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
হামের এই বাড়তি সংক্রমণ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ায় চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে হামের জটিলতা আরও মারাত্মক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। অভিভাবকদের মধ্যে টিকা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা এবং প্রাথমিক উপসর্গ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই সংক্রমণ আরও বড় আকার নিতে পারে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। সময়মতো টিকা গ্রহণ ও সচেতন আচরণই পারে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে। এখনই সতর্ক না হলে, এর মূল্য দিতে হতে পারে আরও বেশি প্রাণহানির মাধ্যমে।

আপনার মতামত লিখুন