চট্টগ্রামে একটু বৃষ্টি হলেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। শহরের ব্যস্ততম এলাকা চকবাজার পরিণত হয় অস্থায়ী জলরাশিতে—যেখানে পথচারী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে যানবাহন সবাই পড়ে বিপাকে। সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর এমনই একটি চিত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলছেন—“আর নয় কক্সবাজার, বৃষ্টি হলে চলে আসুন চকবাজার।”
চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা চকবাজারে সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে প্রধান সড়কসহ আশপাশের অলিগলি পানিতে ডুবে যায়। এতে স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। স্থানীয়রা জানান, এমন পরিস্থিতি নতুন নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে সামান্য বৃষ্টিতেই এই এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
বৃষ্টির পর চকবাজারের বিভিন্ন অংশে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। অনেক জায়গায় ড্রেনের পানি উপচে সড়কে উঠে আসে, যা দুর্গন্ধযুক্ত ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। এতে দোকানপাটে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও উঠেছে।
পথচারীরা বাধ্য হয়ে পানি মাড়িয়ে চলাচল করছেন, আর যানবাহনগুলো ধীরগতিতে চলায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকেরা বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “প্রতিবার বৃষ্টি হলেই একই অবস্থা। দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে যায়, পণ্য নষ্ট হয়। অথচ স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।”
এই জলাবদ্ধতার ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই রসিকতা করে ‘চকবাজারকে মিনি কক্সবাজার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা রিয়াজের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করেও বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে জানা গেছে। তবে এই ব্যঙ্গ-রসিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও ক্ষোভ।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, “ফেসবুকে দেখে হাস্যরস মনে হলেও বাস্তবে এখানে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। ক্লাসে যেতে পারিনি, রাস্তায় নেমে দেখি পুরো এলাকা পানির নিচে।”
স্থানীয়দের দাবি, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ভরাট, অপর্যাপ্ত নালা পরিষ্কার এবং অবৈধ দখলই মূলত এই সমস্যার জন্য দায়ী। অনেকেই অভিযোগ করেন, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না, ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরা থাকে। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। কয়েকদিন পর আবার আগের মতোই হয়ে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর পরিকল্পনার ঘাটতি এবং জলাধার ও প্রাকৃতিক খালগুলোর সংকোচনও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হতে পারে। এতে করে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচলই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। পানিবাহিত রোগ, ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
একজন চিকিৎসক বলেন, “এ ধরনের নোংরা পানিতে দীর্ঘ সময় থাকলে ত্বকের রোগ, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর।”
এছাড়া ব্যবসায়ীদেরও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। দোকানে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হওয়া, ক্রেতা কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু অস্থায়ীভাবে পানি সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অতীতে বিভিন্ন সময়ে নগর কর্তৃপক্ষ জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প গ্রহণের কথা জানিয়েছিল। বাস্তবে সেই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে একাধিক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
একজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না। পুরো শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে হবে। কোথায় পানি জমছে, কোথায় খাল বন্ধ হয়ে গেছে—এসব নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।”
চট্টগ্রামের চকবাজারে বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু প্রতিবারই এটি নতুন করে ভোগান্তি তৈরি করছে। সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ থাকলেও বাস্তবে এটি একটি গুরুতর নাগরিক সমস্যা। দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
নগরবাসীর প্রত্যাশা—দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে যেন দায়িত্বশীলরা বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধানের পথে এগিয়ে আসেন।
বিষয় : কক্সবাজারে চট্টগ্রামের বৃষ্টিতেই এলাকাবাসী

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
চট্টগ্রামে একটু বৃষ্টি হলেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। শহরের ব্যস্ততম এলাকা চকবাজার পরিণত হয় অস্থায়ী জলরাশিতে—যেখানে পথচারী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে যানবাহন সবাই পড়ে বিপাকে। সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর এমনই একটি চিত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলছেন—“আর নয় কক্সবাজার, বৃষ্টি হলে চলে আসুন চকবাজার।”
চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা চকবাজারে সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে প্রধান সড়কসহ আশপাশের অলিগলি পানিতে ডুবে যায়। এতে স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। স্থানীয়রা জানান, এমন পরিস্থিতি নতুন নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে সামান্য বৃষ্টিতেই এই এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
বৃষ্টির পর চকবাজারের বিভিন্ন অংশে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। অনেক জায়গায় ড্রেনের পানি উপচে সড়কে উঠে আসে, যা দুর্গন্ধযুক্ত ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। এতে দোকানপাটে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও উঠেছে।
পথচারীরা বাধ্য হয়ে পানি মাড়িয়ে চলাচল করছেন, আর যানবাহনগুলো ধীরগতিতে চলায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকেরা বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “প্রতিবার বৃষ্টি হলেই একই অবস্থা। দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে যায়, পণ্য নষ্ট হয়। অথচ স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।”
এই জলাবদ্ধতার ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই রসিকতা করে ‘চকবাজারকে মিনি কক্সবাজার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা রিয়াজের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করেও বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে জানা গেছে। তবে এই ব্যঙ্গ-রসিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও ক্ষোভ।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, “ফেসবুকে দেখে হাস্যরস মনে হলেও বাস্তবে এখানে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। ক্লাসে যেতে পারিনি, রাস্তায় নেমে দেখি পুরো এলাকা পানির নিচে।”
স্থানীয়দের দাবি, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ভরাট, অপর্যাপ্ত নালা পরিষ্কার এবং অবৈধ দখলই মূলত এই সমস্যার জন্য দায়ী। অনেকেই অভিযোগ করেন, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না, ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরা থাকে। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। কয়েকদিন পর আবার আগের মতোই হয়ে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর পরিকল্পনার ঘাটতি এবং জলাধার ও প্রাকৃতিক খালগুলোর সংকোচনও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হতে পারে। এতে করে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচলই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। পানিবাহিত রোগ, ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
একজন চিকিৎসক বলেন, “এ ধরনের নোংরা পানিতে দীর্ঘ সময় থাকলে ত্বকের রোগ, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর।”
এছাড়া ব্যবসায়ীদেরও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। দোকানে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হওয়া, ক্রেতা কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু অস্থায়ীভাবে পানি সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অতীতে বিভিন্ন সময়ে নগর কর্তৃপক্ষ জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প গ্রহণের কথা জানিয়েছিল। বাস্তবে সেই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে একাধিক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
একজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না। পুরো শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে হবে। কোথায় পানি জমছে, কোথায় খাল বন্ধ হয়ে গেছে—এসব নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।”
চট্টগ্রামের চকবাজারে বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু প্রতিবারই এটি নতুন করে ভোগান্তি তৈরি করছে। সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ থাকলেও বাস্তবে এটি একটি গুরুতর নাগরিক সমস্যা। দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
নগরবাসীর প্রত্যাশা—দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে যেন দায়িত্বশীলরা বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধানের পথে এগিয়ে আসেন।

আপনার মতামত লিখুন