এক দিনের বৃষ্টিতেই অচল কুমিল্লা, বিপাকে রোগী-শিক্ষার্থী সবাই
মৌসুমের শুরুতেই ভারী বৃষ্টি আর কালবৈশাখীর দাপটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে কুমিল্লা। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পানির নিচে চলে যাওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। অফিসগামী মানুষ থেকে শুরু করে রোগী, শিক্ষার্থী—সবাইকে পড়তে হয়েছে ভোগান্তিতে।
গতকাল শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির পানি নামার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় সব সড়কেই পানি জমে গেছে। বিশেষ করে কুমিল্লা স্টেডিয়াম সড়কে হাঁটু সমান পানি জমে থাকায় চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পানির মধ্যে পড়ে তিনটি গাড়ি বিকল হয়ে রাস্তার মাঝেই আটকে ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেকেই বাধ্য হয়ে হেঁটে বা বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক লাকসাম রোডেও একই চিত্র দেখা যায়। সাধারণ সময়ে যেখানে ২০ টাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাওয়া যায়, সেখানে যাত্রীদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়েছে। বৃষ্টিকে কেন্দ্র করে এমন বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়, তবে এবার পরিস্থিতি ছিল আরও প্রকট। অনেক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বিকল্প না থাকায় বেশি ভাড়া দিয়েই চলাচল করতে বাধ্য হয়েছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। বিশেষ করে সালাউদ্দিন মোড় এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি আটকে থাকতে দেখা গেছে। এতে করে কর্মজীবী মানুষের সময় নষ্টের পাশাপাশি জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষও চরম সমস্যায় পড়েন।
এদিকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। চলমান এসএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই অনেক শিক্ষার্থীকে পানির মধ্যে দিয়েই কেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে। ঈশ্বর পাঠশালার সামনে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে, যেখানে পরীক্ষার্থীরা ভিজে কাপড়েই কেন্দ্রে প্রবেশ করছে। অভিভাবকরাও উদ্বেগ আর দুর্ভোগ নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে ছিলেন।
শুধু রাস্তাঘাটই নয়, জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. মাসুদ পারভেজ জানান, বৃষ্টির কারণে পুরো ক্যাম্পাস পানিতে ডুবে যায়, কোথাও কোথাও হাঁটুর ওপরে পানি জমে ছিল। এতে রোগী, চিকিৎসক ও স্টাফদের চলাচলে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়। জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের পাশের ড্রেনগুলো ঠিকমতো সংস্কার করা না হওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার সমাধান না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন জানান, পানি সরানোর জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে হাসপাতাল এলাকায় কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পটভূমি হিসেবে জানা যায়, কুমিল্লা শহরে জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। বর্ষা মৌসুম এলেই শহরের নিচু এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খাল দখল হয়ে যাওয়ার কারণে পানি দ্রুত নামতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়াই এ সমস্যার বড় কারণ।
বাংলাদেশের অনেক শহরের মতো কুমিল্লাতেও জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, শুধু অস্থায়ী পানি সরানোর কাজ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাল পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরুতেই এমন জলাবদ্ধতা নগরবাসীর জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সামনে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি—নইলে প্রতি বছর একই দুর্ভোগে পড়তে হবে কুমিল্লাবাসীকে।