যশোরে বহু প্রতীক্ষিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার দুপুর ২টার দিকে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ। দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন যশোরবাসী। অবশেষে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করায় অনেকেই এটিকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
এই প্রকল্পের পেছনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার যশোরে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন দেয়। সে সময় শহরের দক্ষিণে হরিণার বিলে প্রায় ৭৫ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে নানা কারণে দীর্ঘ সময় প্রকল্পের কাজ এগোয়নি। ফলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে যশোর জেনারেল হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। যদিও এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালু থাকে, কিন্তু নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় তাদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ২০১৬ সালে একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলেও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল না থাকায় সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি।
অবশেষে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট একনেক সভায় এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এরপর বর্তমান সরকারের উদ্যোগে প্রকল্পটি আবার গতি পায়। ২০২৫ সালের জুন মাসে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের মাধ্যমে দৃশ্যমান রূপ নিতে যাচ্ছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রায় ৬৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে ১০ তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে থাকবে ৫০০টি শয্যা। এছাড়াও চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য সুবিধাজনক থাকার ব্যবস্থা এবং নার্সিং কলেজ ও হোস্টেল গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন, একটি আধুনিক মিলনায়তন, মসজিদ এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণের কথাও রয়েছে। এসব সুবিধা একত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল শিক্ষা ও চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেয় না, এটি একটি অঞ্চলের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। এখানে নতুন চিকিৎসক তৈরি হয়, গবেষণার সুযোগ তৈরি হয় এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি বড় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা পুরো অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
বর্তমানে যশোরসহ আশপাশের জেলাগুলোর অনেক রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা বা ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। নতুন এই হাসপাতাল চালু হলে যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল জেলার প্রায় ৮০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে রোগীদের ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি চিকিৎসা সেবাও হবে আরও সহজলভ্য।
এছাড়া মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় একটি স্বস্তির বিষয়। এতদিন তাদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের জন্য জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হতো। নতুন হাসপাতাল চালু হলে সেই নির্ভরতা কমবে এবং শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে বড় প্রকল্প হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে নিয়মিত তদারকি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে যশোরে ৫০০ শয্যার এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণ নয়, এটি একটি অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বহু বছরের অপেক্ষার পর শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা ও সময়মতো বাস্তবায়নের ওপর। তবে শুরুটা যেভাবে হয়েছে, তাতে যশোরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
যশোরে বহু প্রতীক্ষিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার দুপুর ২টার দিকে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ। দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন যশোরবাসী। অবশেষে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করায় অনেকেই এটিকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
এই প্রকল্পের পেছনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার যশোরে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন দেয়। সে সময় শহরের দক্ষিণে হরিণার বিলে প্রায় ৭৫ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে নানা কারণে দীর্ঘ সময় প্রকল্পের কাজ এগোয়নি। ফলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে যশোর জেনারেল হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। যদিও এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালু থাকে, কিন্তু নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় তাদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ২০১৬ সালে একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলেও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল না থাকায় সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি।
অবশেষে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট একনেক সভায় এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এরপর বর্তমান সরকারের উদ্যোগে প্রকল্পটি আবার গতি পায়। ২০২৫ সালের জুন মাসে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের মাধ্যমে দৃশ্যমান রূপ নিতে যাচ্ছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রায় ৬৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে ১০ তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে থাকবে ৫০০টি শয্যা। এছাড়াও চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য সুবিধাজনক থাকার ব্যবস্থা এবং নার্সিং কলেজ ও হোস্টেল গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন, একটি আধুনিক মিলনায়তন, মসজিদ এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণের কথাও রয়েছে। এসব সুবিধা একত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল শিক্ষা ও চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেয় না, এটি একটি অঞ্চলের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। এখানে নতুন চিকিৎসক তৈরি হয়, গবেষণার সুযোগ তৈরি হয় এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি বড় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা পুরো অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
বর্তমানে যশোরসহ আশপাশের জেলাগুলোর অনেক রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা বা ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। নতুন এই হাসপাতাল চালু হলে যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল জেলার প্রায় ৮০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে রোগীদের ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি চিকিৎসা সেবাও হবে আরও সহজলভ্য।
এছাড়া মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় একটি স্বস্তির বিষয়। এতদিন তাদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের জন্য জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হতো। নতুন হাসপাতাল চালু হলে সেই নির্ভরতা কমবে এবং শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে বড় প্রকল্প হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে নিয়মিত তদারকি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে যশোরে ৫০০ শয্যার এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণ নয়, এটি একটি অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বহু বছরের অপেক্ষার পর শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা ও সময়মতো বাস্তবায়নের ওপর। তবে শুরুটা যেভাবে হয়েছে, তাতে যশোরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন