কফি মানেই সুবাস, তিক্ত-মিষ্টি স্বাদ আর এক কাপ উষ্ণতায় সতেজ হয়ে ওঠা। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু কফি আছে, যেগুলোর উৎপাদনপ্রক্রিয়া জানলে প্রথমে অবাক হতেই হয়। কারণ এই কফির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় হাতি ও গন্ধগোকুলের মল থেকে সংগ্রহ করা কফি বিন।
‘ব্ল্যাক আইভরি’ ও ‘কোপি লুওয়াক’—দুটি কফিই বিরল ও বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে পরিচিত। সীমিত উৎপাদন, জটিল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিশেষ স্বাদের কারণে এগুলোর দাম সাধারণ কফির তুলনায় অনেক বেশি।
থাইল্যান্ডে উৎপাদিত ব্ল্যাক আইভরি কফি তৈরি করা হয় আরাবিকা কফি চেরি হাতির খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
হাতি সেই কফি চেরি খাওয়ার পর তার পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে বিনগুলো বেরিয়ে আসে। সাধারণত খাবার গ্রহণের প্রায় ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর হাতি মলত্যাগ করে। তখন মল থেকে কফির আস্ত বিনগুলো আলাদা করা হয়।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণ। বিনগুলো পরিষ্কার করে ধুয়ে শুকানো হয়। পরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রোস্ট করার মাধ্যমে তৈরি করা হয় ব্ল্যাক আইভরি কফি।
ব্ল্যাক আইভরি কফির বিশেষত্বের একটি কারণ হিসেবে এর পরিপাকপ্রক্রিয়াকে উল্লেখ করা হয়। হাতির পরিপাকতন্ত্রে থাকা বিভিন্ন এনজাইম কফি বিনের কিছু প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদানে পরিবর্তন আনে বলে উৎপাদকদের দাবি।
এর ফলে কফির তিক্ততা তুলনামূলক কমে গিয়ে চকোলেট, ক্যারামেল ও মাটির মতো মৃদু স্বাদের নোট তৈরি হতে পারে বলে কফি বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে আসে।
তবে এই স্বাদ সবার কাছে একই রকম লাগবে—এমন নয়। কফির স্বাদ নির্ভর করে বিনের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রোস্টিং এবং প্রস্তুত প্রক্রিয়ার ওপরও।
ব্ল্যাক আইভরির উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত। হাতির পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক কফি চেরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভালো বিন সংগ্রহ করাও কঠিন।
তারপর মল থেকে প্রতিটি বিন আলাদা করা, পরিষ্কার করা, শুকানো এবং রোস্ট করার মতো কাজও করতে হয় হাতে।
এই সীমিত উৎপাদন ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ার কারণে ব্ল্যাক আইভরি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল কফি হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন বাজারে এর দাম প্রতি কেজিতে লাখ টাকার কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে।
ব্ল্যাক আইভরির মতোই আলোচিত আরেকটি কফি হলো ইন্দোনেশিয়ার ‘কোপি লুওয়াক’।
‘কোপি’ ইন্দোনেশীয় ভাষায় কফি এবং ‘লুওয়াক’ বলতে বোঝানো হয় এশিয়ান পাম সিভেট বা গন্ধগোকুলকে।
এই নিশাচর প্রাণী পাকা কফি চেরি খায়। ফলের নরম অংশ হজম হলেও কফির শক্ত বীজ পুরোপুরি হজম হয় না। পরে সেটি মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসে।
সেখান থেকে কফি বিন সংগ্রহ করে ভালোভাবে পরিষ্কার, শুকানো ও রোস্ট করা হয়। এরপর সেই বিন দিয়ে তৈরি হয় কোপি লুওয়াক।
কফি চেরি গন্ধগোকুলের পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এনজাইমের সংস্পর্শে আসে। এর ফলে কফি বিনের কিছু রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
কোপি লুওয়াকের ভক্তরা সাধারণত এর মসৃণ, কম তীব্র অম্লতা এবং বিশেষ স্বাদের কথা বলেন। তবে এই কফির স্বাদ নিয়ে সব কফিপ্রেমীর অভিজ্ঞতা এক নয়।
আর একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বাজারে বিক্রি হওয়া সব ‘কোপি লুওয়াক’ একইভাবে উৎপাদিত হয় না। কিছু ক্ষেত্রে গন্ধগোকুলকে খাঁচায় রেখে কফি চেরি খাওয়ানো হয়। এ কারণে প্রাণীর কল্যাণ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনাও রয়েছে।
এই দুই কফির ক্ষেত্রে দাম শুধু স্বাদের কারণে নয়। বিরলতা, সীমিত উৎপাদন, সংগ্রহের জটিলতা, শ্রম এবং বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে এর বিশেষ পরিচিতিও দামের বড় কারণ।
বিশেষ কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ব্ল্যাক আইভরি বা কোপি লুওয়াক পরিবেশন করা হয়। সেখানে এক কাপের দাম সাধারণ কফির তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ, আপনি যখন এক কাপ এই কফি পান করেন, তখন শুধু পানীয়টির স্বাদের জন্য নয়—এর বিরলতা ও ব্যতিক্রমী উৎপাদনপ্রক্রিয়ার জন্যও অর্থ দিচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
কফি মানেই সুবাস, তিক্ত-মিষ্টি স্বাদ আর এক কাপ উষ্ণতায় সতেজ হয়ে ওঠা। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু কফি আছে, যেগুলোর উৎপাদনপ্রক্রিয়া জানলে প্রথমে অবাক হতেই হয়। কারণ এই কফির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় হাতি ও গন্ধগোকুলের মল থেকে সংগ্রহ করা কফি বিন।
‘ব্ল্যাক আইভরি’ ও ‘কোপি লুওয়াক’—দুটি কফিই বিরল ও বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে পরিচিত। সীমিত উৎপাদন, জটিল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিশেষ স্বাদের কারণে এগুলোর দাম সাধারণ কফির তুলনায় অনেক বেশি।
থাইল্যান্ডে উৎপাদিত ব্ল্যাক আইভরি কফি তৈরি করা হয় আরাবিকা কফি চেরি হাতির খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
হাতি সেই কফি চেরি খাওয়ার পর তার পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে বিনগুলো বেরিয়ে আসে। সাধারণত খাবার গ্রহণের প্রায় ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর হাতি মলত্যাগ করে। তখন মল থেকে কফির আস্ত বিনগুলো আলাদা করা হয়।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণ। বিনগুলো পরিষ্কার করে ধুয়ে শুকানো হয়। পরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রোস্ট করার মাধ্যমে তৈরি করা হয় ব্ল্যাক আইভরি কফি।
ব্ল্যাক আইভরি কফির বিশেষত্বের একটি কারণ হিসেবে এর পরিপাকপ্রক্রিয়াকে উল্লেখ করা হয়। হাতির পরিপাকতন্ত্রে থাকা বিভিন্ন এনজাইম কফি বিনের কিছু প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদানে পরিবর্তন আনে বলে উৎপাদকদের দাবি।
এর ফলে কফির তিক্ততা তুলনামূলক কমে গিয়ে চকোলেট, ক্যারামেল ও মাটির মতো মৃদু স্বাদের নোট তৈরি হতে পারে বলে কফি বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে আসে।
তবে এই স্বাদ সবার কাছে একই রকম লাগবে—এমন নয়। কফির স্বাদ নির্ভর করে বিনের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রোস্টিং এবং প্রস্তুত প্রক্রিয়ার ওপরও।
ব্ল্যাক আইভরির উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত। হাতির পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক কফি চেরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভালো বিন সংগ্রহ করাও কঠিন।
তারপর মল থেকে প্রতিটি বিন আলাদা করা, পরিষ্কার করা, শুকানো এবং রোস্ট করার মতো কাজও করতে হয় হাতে।
এই সীমিত উৎপাদন ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ার কারণে ব্ল্যাক আইভরি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল কফি হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন বাজারে এর দাম প্রতি কেজিতে লাখ টাকার কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে।
ব্ল্যাক আইভরির মতোই আলোচিত আরেকটি কফি হলো ইন্দোনেশিয়ার ‘কোপি লুওয়াক’।
‘কোপি’ ইন্দোনেশীয় ভাষায় কফি এবং ‘লুওয়াক’ বলতে বোঝানো হয় এশিয়ান পাম সিভেট বা গন্ধগোকুলকে।
এই নিশাচর প্রাণী পাকা কফি চেরি খায়। ফলের নরম অংশ হজম হলেও কফির শক্ত বীজ পুরোপুরি হজম হয় না। পরে সেটি মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসে।
সেখান থেকে কফি বিন সংগ্রহ করে ভালোভাবে পরিষ্কার, শুকানো ও রোস্ট করা হয়। এরপর সেই বিন দিয়ে তৈরি হয় কোপি লুওয়াক।
কফি চেরি গন্ধগোকুলের পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এনজাইমের সংস্পর্শে আসে। এর ফলে কফি বিনের কিছু রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
কোপি লুওয়াকের ভক্তরা সাধারণত এর মসৃণ, কম তীব্র অম্লতা এবং বিশেষ স্বাদের কথা বলেন। তবে এই কফির স্বাদ নিয়ে সব কফিপ্রেমীর অভিজ্ঞতা এক নয়।
আর একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বাজারে বিক্রি হওয়া সব ‘কোপি লুওয়াক’ একইভাবে উৎপাদিত হয় না। কিছু ক্ষেত্রে গন্ধগোকুলকে খাঁচায় রেখে কফি চেরি খাওয়ানো হয়। এ কারণে প্রাণীর কল্যাণ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনাও রয়েছে।
এই দুই কফির ক্ষেত্রে দাম শুধু স্বাদের কারণে নয়। বিরলতা, সীমিত উৎপাদন, সংগ্রহের জটিলতা, শ্রম এবং বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে এর বিশেষ পরিচিতিও দামের বড় কারণ।
বিশেষ কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ব্ল্যাক আইভরি বা কোপি লুওয়াক পরিবেশন করা হয়। সেখানে এক কাপের দাম সাধারণ কফির তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ, আপনি যখন এক কাপ এই কফি পান করেন, তখন শুধু পানীয়টির স্বাদের জন্য নয়—এর বিরলতা ও ব্যতিক্রমী উৎপাদনপ্রক্রিয়ার জন্যও অর্থ দিচ্ছেন।

আপনার মতামত লিখুন