রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ রোববার। দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এই মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যেই রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে, যা বিচারাঙ্গনে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। রায়ের সময় মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে আদালতে হাজির করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই মামলাটি শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ, ঘটনাটির ভয়াবহতা যেমন জনমনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে, তেমনি বিচারিক কার্যক্রমও এগিয়েছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করেন। রায় ঘোষণা হলে অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক—সব মিলিয়ে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হবে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে।
আইন সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলায় দ্রুত বিচার জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মামলার শেষ পর্যায়ের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছে দাবি করে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আদালতে ঘটনার পুরো বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সোহেল রানা শুধু শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেননি, ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুন সহযোগিতা করেছেন বলে সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সোহেল রানার দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথাও উল্লেখ করে। ওই জবানবন্দিতে তিনি শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
এর আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুন নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। আদালতে সোহেল রানা ক্ষমাও প্রার্থনা করেন।
তবে আদালত শেষ পর্যন্ত কোন সাক্ষ্য, প্রমাণ ও আইনি ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দেন, সেটিই আজকের রায়ে স্পষ্ট হবে।
গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে অভিযুক্ত করা হয়।
পরে মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। একই দিনে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পরবর্তী কার্যক্রমের তারিখ নির্ধারণ করেন।
১ জুন অভিযোগ গঠনের পরপরই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। গত মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় এবং পরবর্তী দুই দিনের মধ্যে মামলাটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ওই শিশুর মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের ভয়াবহতা দেখে হতবাক হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মরদেহের কাঁধ থেকে দুই হাত আংশিক বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে একটি রঙের বালতির ভেতর শিশুটির মাথা পাওয়া যায়।
এই ঘটনার পরপরই এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শিশুটির পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
পরদিন, ২০ মে, শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। একই দিন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়।
শিশুরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও নিরাপত্তাহীন অংশগুলোর একটি। যখন কোনো শিশু এমন নির্মম অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তাবোধকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে শুধু কঠোর শাস্তিই যথেষ্ট নয়; পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারিও জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দ্রুত শনাক্ত করার উদ্যোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
আজকের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে নিহত শিশুর পরিবার, আইনজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষ। আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার বিচারিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ রোববার। দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এই মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যেই রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে, যা বিচারাঙ্গনে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। রায়ের সময় মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে আদালতে হাজির করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই মামলাটি শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ, ঘটনাটির ভয়াবহতা যেমন জনমনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে, তেমনি বিচারিক কার্যক্রমও এগিয়েছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করেন। রায় ঘোষণা হলে অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক—সব মিলিয়ে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হবে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে।
আইন সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলায় দ্রুত বিচার জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মামলার শেষ পর্যায়ের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছে দাবি করে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আদালতে ঘটনার পুরো বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সোহেল রানা শুধু শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেননি, ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুন সহযোগিতা করেছেন বলে সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সোহেল রানার দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথাও উল্লেখ করে। ওই জবানবন্দিতে তিনি শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
এর আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুন নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। আদালতে সোহেল রানা ক্ষমাও প্রার্থনা করেন।
তবে আদালত শেষ পর্যন্ত কোন সাক্ষ্য, প্রমাণ ও আইনি ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দেন, সেটিই আজকের রায়ে স্পষ্ট হবে।
গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে অভিযুক্ত করা হয়।
পরে মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। একই দিনে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পরবর্তী কার্যক্রমের তারিখ নির্ধারণ করেন।
১ জুন অভিযোগ গঠনের পরপরই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। গত মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় এবং পরবর্তী দুই দিনের মধ্যে মামলাটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ওই শিশুর মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের ভয়াবহতা দেখে হতবাক হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মরদেহের কাঁধ থেকে দুই হাত আংশিক বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে একটি রঙের বালতির ভেতর শিশুটির মাথা পাওয়া যায়।
এই ঘটনার পরপরই এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শিশুটির পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
পরদিন, ২০ মে, শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। একই দিন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়।
শিশুরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও নিরাপত্তাহীন অংশগুলোর একটি। যখন কোনো শিশু এমন নির্মম অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তাবোধকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে শুধু কঠোর শাস্তিই যথেষ্ট নয়; পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারিও জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দ্রুত শনাক্ত করার উদ্যোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
আজকের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে নিহত শিশুর পরিবার, আইনজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষ। আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার বিচারিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন