সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বন বিভাগের এক কর্মকর্তার গুলিতে জেলে নিহত হওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। নিহত জেলের মরদেহ লোকালয়ে পৌঁছানোর পর বিক্ষুব্ধ জনতা বন বিভাগের একটি স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সোমবার সকালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের পাটকোস্টা হেলাবাসী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) শ্যামনগর উপজেলার সোরা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও জেলেদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমিনুরসহ চারজন জেলে কয়েকদিন আগে বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কাঁকড়া আহরণ। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁরা পাটকোস্টা এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
জেলেদের সঙ্গে থাকা আহাম্মাদ আলী ও মো. সেলিমের বরাত দিয়ে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, বন বিভাগের স্মার্ট টহল দলের সদস্যরা জেলেদের দাঁড়াতে বলেন। তবে নৌকা থামাতে কিছুটা দেরি হওয়ায় নলিয়ান স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেন তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তাঁর দাবি, ওই গুলিতে আমিনুর রহমান গাজী আহত হন। পরে সহকর্মীরা তাঁকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে ফেরার চেষ্টা করলে কিছু দূর যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে এ ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। গুলিবর্ষণের পরিস্থিতি কী ছিল এবং কেন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে—সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।
দুপুরে আমিনুরের মরদেহ লোকালয়ে পৌঁছালে শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা বন বিভাগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনে হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্টেশনের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। কাঠের দেয়াল, চেয়ার-টেবিলসহ বেশ কিছু জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে।
বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, “মরদেহ আসার পর কিছু মানুষ উত্তেজিত হয়ে স্টেশনে হামলা চালায়। এতে বিভিন্ন জিনিসপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি জানান, পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ মুহূর্তে পরিস্থিতি শান্ত রাখাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
খুলনা বিভাগের বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন এবং বিষয়টি সরেজমিনে দেখতে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
বন বিভাগের একাধিক সূত্র বলছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত হতে পারে। জেলেদের বক্তব্য, টহল দলের আচরণ এবং অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা—সবকিছুই যাচাই করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণকে কেন্দ্র করে জেলে ও বন বিভাগের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের উত্তেজনা রয়েছে। কখনও পাস নিয়ে জটিলতা, কখনও অভিযানের নামে হয়রানির অভিযোগ—এসব কারণে বননির্ভর মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় নিয়ম ভঙ্গ, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অনেক সময় মাঠপর্যায়ে ভুল বোঝাবুঝি থেকেও সংঘাত তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জীবিকার বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ বনকে ঘিরে হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। সেখানে কোনো সহিংস ঘটনা দ্রুত জনঅসন্তোষে রূপ নিতে পারে।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিহত আমিনুর রহমান গাজীর মৃত্যুর ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে গুলির ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় টহল কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বন বিভাগের এক কর্মকর্তার গুলিতে জেলে নিহত হওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। নিহত জেলের মরদেহ লোকালয়ে পৌঁছানোর পর বিক্ষুব্ধ জনতা বন বিভাগের একটি স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সোমবার সকালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের পাটকোস্টা হেলাবাসী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) শ্যামনগর উপজেলার সোরা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও জেলেদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমিনুরসহ চারজন জেলে কয়েকদিন আগে বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কাঁকড়া আহরণ। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁরা পাটকোস্টা এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
জেলেদের সঙ্গে থাকা আহাম্মাদ আলী ও মো. সেলিমের বরাত দিয়ে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, বন বিভাগের স্মার্ট টহল দলের সদস্যরা জেলেদের দাঁড়াতে বলেন। তবে নৌকা থামাতে কিছুটা দেরি হওয়ায় নলিয়ান স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেন তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তাঁর দাবি, ওই গুলিতে আমিনুর রহমান গাজী আহত হন। পরে সহকর্মীরা তাঁকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে ফেরার চেষ্টা করলে কিছু দূর যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে এ ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। গুলিবর্ষণের পরিস্থিতি কী ছিল এবং কেন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে—সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।
দুপুরে আমিনুরের মরদেহ লোকালয়ে পৌঁছালে শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা বন বিভাগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনে হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্টেশনের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। কাঠের দেয়াল, চেয়ার-টেবিলসহ বেশ কিছু জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে।
বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, “মরদেহ আসার পর কিছু মানুষ উত্তেজিত হয়ে স্টেশনে হামলা চালায়। এতে বিভিন্ন জিনিসপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি জানান, পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ মুহূর্তে পরিস্থিতি শান্ত রাখাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
খুলনা বিভাগের বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন এবং বিষয়টি সরেজমিনে দেখতে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
বন বিভাগের একাধিক সূত্র বলছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত হতে পারে। জেলেদের বক্তব্য, টহল দলের আচরণ এবং অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা—সবকিছুই যাচাই করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণকে কেন্দ্র করে জেলে ও বন বিভাগের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের উত্তেজনা রয়েছে। কখনও পাস নিয়ে জটিলতা, কখনও অভিযানের নামে হয়রানির অভিযোগ—এসব কারণে বননির্ভর মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় নিয়ম ভঙ্গ, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অনেক সময় মাঠপর্যায়ে ভুল বোঝাবুঝি থেকেও সংঘাত তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জীবিকার বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ বনকে ঘিরে হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। সেখানে কোনো সহিংস ঘটনা দ্রুত জনঅসন্তোষে রূপ নিতে পারে।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিহত আমিনুর রহমান গাজীর মৃত্যুর ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে গুলির ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় টহল কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন