রাজাপুরে খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ, পরিদর্শনে গিয়ে প্রস্থ কম পেলেন ইউএনও
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে গিয়ে কাজের গড়মিল পেয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে তিনি নিজেই খালের বিভিন্ন অংশে মাপ নিয়ে নির্ধারিত প্রস্থের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার পার্থক্য দেখতে পান।
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি উপজেলার আঙ্গারিয়া এলাকায় রাঢ়ি বাড়ির সামনে থেকে শুরু হওয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান। সেখানে খালের কয়েকটি স্থানে ফিতা দিয়ে মাপ নেওয়া হয়। এ সময় দেখা যায়, যেখানে খালের প্রস্থ ৩০ ফুট হওয়ার কথা, সেখানে অনেক জায়গায় তা ২৬ থেকে ২৮ ফুট পাওয়া গেছে।
পরিদর্শনের সময় রাজাপুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনের এই সরাসরি পরিদর্শনে স্থানীয়দের অভিযোগ নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার খাল পুনঃখননের জন্য প্রায় ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শুধু এই একটি খালই নয়, পুরো উপজেলায় ১৩টি খাল খনন ও ৩টি বাঁধ নির্মাণের জন্য মোট প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে আলোচিত দুটি খালের ৪ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার খননে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
স্থানীয় কৃষক ও সুবিধাভোগীরা অভিযোগ করেছেন, কাজটি শিডিউল অনুযায়ী হয়নি। তাদের ভাষায়, খালের মাঝখান থেকে সামান্য পলি সরিয়ে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে খালটি আগের মতোই সংকীর্ণ রয়ে গেছে এবং প্রত্যাশিত পানি প্রবাহ তৈরি হয়নি। এতে কৃষকেরা সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, খনন কাজ শুরুর আগে খালের দুই পাড়ের অনেক ফলজ ও বনজ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী খাল গভীর বা প্রশস্ত করা হয়নি। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে মাছ চাষ বা সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের সম্ভাবনাও কমে গেছে। এছাড়া খালের পাড় তির্যকভাবে কাটার কারণে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন।
পটভূমি হিসেবে জানা যায়, গ্রামীণ এলাকার খাল পুনঃখনন প্রকল্প সাধারণত কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ানো, বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং জলাবদ্ধতা কমানোর জন্য নেওয়া হয়। একই সঙ্গে এসব খাল স্থানীয়ভাবে মাছ চাষ ও নৌযাতায়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এলজিইডি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের ছোট অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে থাকে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এ কারণে খাল পুনঃখননের কাজ সঠিকভাবে না হলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও ভেঙে যায়। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পের শুরুতেই সঠিক তদারকি থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
পরিদর্শন শেষে ইউএনও রিফাত আরা মৌরি সাংবাদিকদের জানান, অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি নিজে মাপ নিয়েছেন এবং কিছু জায়গায় নির্ধারিত প্রস্থ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের এই তৎপরতার ফলে প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে শেষ হবে এবং কৃষকেরা তাদের কাঙ্ক্ষিত সেচ সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও কঠোর নজরদারি থাকবে বলেও আশা করছেন তারা।