দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের চাপ এবার সরাসরি রাজধানী ঢাকায় এসে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং চলার পর এবার ঢাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিষয়টি সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ সামাল দিতেই ঢাকায় সীমিত আকারে লোডশেডিং চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় লোডশেডিং চলছে। এবার রাজধানীকেও সেই ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে একটি ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেন, বিদ্যুৎ বণ্টনে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি বাস্তবতা। তার ভাষায়, “শহরের মানুষ আরামে থাকবে, আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।” তাই সবার জন্য সমানভাবে বিদ্যুৎ বণ্টনের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত।
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং পরীক্ষামূলকভাবে কার্যকর করা হতে পারে। তবে এটি পরিস্থিতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। মূল সমস্যা হলো জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, বিশেষ করে গ্যাস সংকট।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। আবার এলএনজি আমদানির সুযোগ থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জ্বালানি ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা এবং বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে উৎপাদন বেশি হলেও বাস্তবে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন চাহিদা বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।
ঢাকায় লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হলেও নগর জীবনে এর প্রভাব পড়বে ব্যাপকভাবে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে অফিস, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল সেবা, অনলাইন কার্যক্রম এবং ছোট ব্যবসাগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে গরমের মৌসুমে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে নগর জীবনে ভোগান্তি আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সমস্যার মূল জায়গা এখন জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। শুধু লোডশেডিং দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
সরকার বলছে, দেশের গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত। সেচ, কৃষি ও দৈনন্দিন কাজে সেখানে বিদ্যুৎ সংকট বেশি অনুভূত হয়। তাই শহরেও কিছুটা লোডশেডিং এনে সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে নগরবাসীর একটি অংশ মনে করছে, সমস্যার সমাধান হিসেবে লোডশেডিং নয়, বরং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নই হওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে পরীক্ষামূলক লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্ত দেশের বিদ্যুৎ খাতের বাস্তব সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। এটি একদিকে যেমন সমতা আনার চেষ্টা, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে লোডশেডিং হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের চাপ এবার সরাসরি রাজধানী ঢাকায় এসে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং চলার পর এবার ঢাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিষয়টি সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ সামাল দিতেই ঢাকায় সীমিত আকারে লোডশেডিং চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় লোডশেডিং চলছে। এবার রাজধানীকেও সেই ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে একটি ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেন, বিদ্যুৎ বণ্টনে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি বাস্তবতা। তার ভাষায়, “শহরের মানুষ আরামে থাকবে, আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।” তাই সবার জন্য সমানভাবে বিদ্যুৎ বণ্টনের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত।
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং পরীক্ষামূলকভাবে কার্যকর করা হতে পারে। তবে এটি পরিস্থিতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। মূল সমস্যা হলো জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, বিশেষ করে গ্যাস সংকট।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। আবার এলএনজি আমদানির সুযোগ থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জ্বালানি ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা এবং বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে উৎপাদন বেশি হলেও বাস্তবে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন চাহিদা বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।
ঢাকায় লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হলেও নগর জীবনে এর প্রভাব পড়বে ব্যাপকভাবে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে অফিস, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল সেবা, অনলাইন কার্যক্রম এবং ছোট ব্যবসাগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে গরমের মৌসুমে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে নগর জীবনে ভোগান্তি আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সমস্যার মূল জায়গা এখন জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। শুধু লোডশেডিং দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
সরকার বলছে, দেশের গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত। সেচ, কৃষি ও দৈনন্দিন কাজে সেখানে বিদ্যুৎ সংকট বেশি অনুভূত হয়। তাই শহরেও কিছুটা লোডশেডিং এনে সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে নগরবাসীর একটি অংশ মনে করছে, সমস্যার সমাধান হিসেবে লোডশেডিং নয়, বরং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নই হওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে পরীক্ষামূলক লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্ত দেশের বিদ্যুৎ খাতের বাস্তব সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। এটি একদিকে যেমন সমতা আনার চেষ্টা, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে লোডশেডিং হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন