নওগাঁর নিয়ামতপুরে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে এক পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মামা, মামি ও দুই শিশুসন্তানকে পরিকল্পনা করে হত্যার কথা আদালতে স্বীকার করেছেন ভাগনে সবুজ রানা (২৫)।
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে নওগাঁর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সবুজ রানা হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনার কথা জানান। একই ঘটনায় গ্রেপ্তার অপর দুই আসামি শহিদুল মণ্ডল (৫০) ও তার ছেলে শাহিন মণ্ডলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে, যা বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চাঁদ আলী জানান, সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিহত হাবিবুর রহমানের সঙ্গে সবুজ রানাদের বিরোধ চলছিল। জবানবন্দিতে সবুজ স্বীকার করেছেন, জমি বেশি লিখে নেওয়ার ক্ষোভ থেকেই তিনি মামাকে “নির্বংশ করার” হুমকি দিয়েছিলেন। পরে সেই হুমকিই বাস্তবে রূপ নেয়।
জবানবন্দিতে সবুজ রানা বলেন, ঘটনার দিন সোমবার দুপুরে তিনি তার মামা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া হাটে গরু কিনতে যান। গরু না কিনেই সন্ধ্যায় তারা বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর রাতে সুযোগ বুঝে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনায় তার সঙ্গে ছিলেন খালু শহিদুল ও খালাতো ভাই শাহিন।
তিনি আরও জানান, রাতে মামার বাড়িতে ভাত খেয়ে চলে যাওয়ার ভান করেন তিনি। এ সময় শাহিন বাড়ির একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন মূল দরজা খুলে দেন। এরপর শহিদুল, সবুজসহ আরও কয়েকজন বাড়িতে প্রবেশ করেন।
প্রথমেই তারা নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে দেন, যাতে তিনি বাইরে বের হতে না পারেন। এরপর হাবিবুর রহমানের ঘরে ঢুকে তাকে চেপে ধরে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে অন্য ঘরে থাকা স্ত্রী পপি সুলতানাকেও আঘাত করে হত্যা করা হয়। একইভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু পারভেজ রহমান (৯) ও সাদিয়া আক্তারকেও হত্যা করা হয়।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরপরই এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ থাকলেও এমন ভয়াবহ ঘটনার আশঙ্কা কেউ করেননি।
পুলিশ জানায়, ঘটনার পরপরই এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিহতের ভগ্নিপতি শহিদুল মণ্ডল, তার ছেলে শাহিন মণ্ডল এবং ভাগনে সবুজ রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই হত্যার পেছনে সম্পত্তি বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। পরে আদালতে সবুজ রানা বিস্তারিত স্বীকারোক্তি দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়ামতপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ নতুন কিছু নয়। অতীতে এ ধরনের বিরোধ থেকে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তবে একই পরিবারের চার সদস্যকে একসঙ্গে হত্যা করার মতো ঘটনা খুবই বিরল, যা পুরো এলাকাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে চাপা অবস্থায় থাকে এবং হঠাৎ সহিংস রূপ নেয়। এ কারণে স্থানীয়ভাবে সালিশ বা আইনি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
একটি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নিতে পারে, নিয়ামতপুরের এই ঘটনা তারই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে থাকল। স্থানীয়রা দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে
বিষয় : শিশুকে হত্যা সম্পত্তি

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
নওগাঁর নিয়ামতপুরে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে এক পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মামা, মামি ও দুই শিশুসন্তানকে পরিকল্পনা করে হত্যার কথা আদালতে স্বীকার করেছেন ভাগনে সবুজ রানা (২৫)।
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে নওগাঁর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সবুজ রানা হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনার কথা জানান। একই ঘটনায় গ্রেপ্তার অপর দুই আসামি শহিদুল মণ্ডল (৫০) ও তার ছেলে শাহিন মণ্ডলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে, যা বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চাঁদ আলী জানান, সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিহত হাবিবুর রহমানের সঙ্গে সবুজ রানাদের বিরোধ চলছিল। জবানবন্দিতে সবুজ স্বীকার করেছেন, জমি বেশি লিখে নেওয়ার ক্ষোভ থেকেই তিনি মামাকে “নির্বংশ করার” হুমকি দিয়েছিলেন। পরে সেই হুমকিই বাস্তবে রূপ নেয়।
জবানবন্দিতে সবুজ রানা বলেন, ঘটনার দিন সোমবার দুপুরে তিনি তার মামা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া হাটে গরু কিনতে যান। গরু না কিনেই সন্ধ্যায় তারা বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর রাতে সুযোগ বুঝে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনায় তার সঙ্গে ছিলেন খালু শহিদুল ও খালাতো ভাই শাহিন।
তিনি আরও জানান, রাতে মামার বাড়িতে ভাত খেয়ে চলে যাওয়ার ভান করেন তিনি। এ সময় শাহিন বাড়ির একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন মূল দরজা খুলে দেন। এরপর শহিদুল, সবুজসহ আরও কয়েকজন বাড়িতে প্রবেশ করেন।
প্রথমেই তারা নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে দেন, যাতে তিনি বাইরে বের হতে না পারেন। এরপর হাবিবুর রহমানের ঘরে ঢুকে তাকে চেপে ধরে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে অন্য ঘরে থাকা স্ত্রী পপি সুলতানাকেও আঘাত করে হত্যা করা হয়। একইভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু পারভেজ রহমান (৯) ও সাদিয়া আক্তারকেও হত্যা করা হয়।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরপরই এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ থাকলেও এমন ভয়াবহ ঘটনার আশঙ্কা কেউ করেননি।
পুলিশ জানায়, ঘটনার পরপরই এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিহতের ভগ্নিপতি শহিদুল মণ্ডল, তার ছেলে শাহিন মণ্ডল এবং ভাগনে সবুজ রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই হত্যার পেছনে সম্পত্তি বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। পরে আদালতে সবুজ রানা বিস্তারিত স্বীকারোক্তি দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়ামতপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ নতুন কিছু নয়। অতীতে এ ধরনের বিরোধ থেকে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তবে একই পরিবারের চার সদস্যকে একসঙ্গে হত্যা করার মতো ঘটনা খুবই বিরল, যা পুরো এলাকাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে চাপা অবস্থায় থাকে এবং হঠাৎ সহিংস রূপ নেয়। এ কারণে স্থানীয়ভাবে সালিশ বা আইনি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
একটি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নিতে পারে, নিয়ামতপুরের এই ঘটনা তারই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে থাকল। স্থানীয়রা দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে

আপনার মতামত লিখুন