বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথটি এখন শুধু একটি ভৌগোলিক পথ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত।
মাত্র ৩৯ কিলোমিটার চওড়া এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২১ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা হরমুজ প্রণালিকে “বিশ্বের এনার্জি গেটওয়ে” হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশে এই একটি জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বৃহৎ অর্থনীতিগুলো তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ এই পথ দিয়েই আমদানি করে থাকে।
হরমুজ নামটি এসেছে মধ্য ফারসি “হরমোজ” থেকে, যা জ্ঞান ও শৃঙ্খলার দেবতা আহুরা মাজদার একটি রূপ হিসেবে পরিচিত।
একাদশ শতকে একজন আরব বণিক-শাসক এখানে হরমুজ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে এটি মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে চীন, ভারত, আরব এবং ইউরোপীয় বণিকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
পরবর্তীতে ১৫০৭ সালে পর্তুগিজ নৌ-অভিযাত্রী আফোনসো ডি আলবুকার্ক এই অঞ্চল দখল করেন। প্রায় এক শতাব্দী পর ১৬২২ সালে পারস্যের শাহ আব্বাস প্রথম ইংরেজদের সহায়তায় এটি পুনর্দখল করেন।
হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় “চোক পয়েন্ট”—অর্থাৎ এমন একটি সংকীর্ণ পথ, যা বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বিশাল—
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালি বন্ধ হলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
হরমুজ প্রণালি শুধু তেল পরিবহনের পথ নয়, বরং বৈশ্বিক শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত।
এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়—
ফলে এই পথ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প খাত পর্যন্ত বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে কয়েকটি রুট তৈরি করা হয়েছে—
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিকল্প রুট একত্রেও হরমুজের সক্ষমতার সমান হতে পারে না।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান—এই জলপথে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল অবাধ থাকতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি—এটি তাদের সার্বভৌম অধিকারভুক্ত অঞ্চল।
এই দুই অবস্থানের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব হবে বিশ্বজুড়ে।
এর মধ্যে থাকতে পারে—
বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি শুধু একটি ভৌগোলিক জলপথ নয়—এটি আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও এই পথ সচল রাখা এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথটি এখন শুধু একটি ভৌগোলিক পথ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত।
মাত্র ৩৯ কিলোমিটার চওড়া এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২১ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা হরমুজ প্রণালিকে “বিশ্বের এনার্জি গেটওয়ে” হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশে এই একটি জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বৃহৎ অর্থনীতিগুলো তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ এই পথ দিয়েই আমদানি করে থাকে।
হরমুজ নামটি এসেছে মধ্য ফারসি “হরমোজ” থেকে, যা জ্ঞান ও শৃঙ্খলার দেবতা আহুরা মাজদার একটি রূপ হিসেবে পরিচিত।
একাদশ শতকে একজন আরব বণিক-শাসক এখানে হরমুজ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে এটি মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে চীন, ভারত, আরব এবং ইউরোপীয় বণিকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
পরবর্তীতে ১৫০৭ সালে পর্তুগিজ নৌ-অভিযাত্রী আফোনসো ডি আলবুকার্ক এই অঞ্চল দখল করেন। প্রায় এক শতাব্দী পর ১৬২২ সালে পারস্যের শাহ আব্বাস প্রথম ইংরেজদের সহায়তায় এটি পুনর্দখল করেন।
হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় “চোক পয়েন্ট”—অর্থাৎ এমন একটি সংকীর্ণ পথ, যা বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বিশাল—
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালি বন্ধ হলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
হরমুজ প্রণালি শুধু তেল পরিবহনের পথ নয়, বরং বৈশ্বিক শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত।
এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়—
ফলে এই পথ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প খাত পর্যন্ত বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে কয়েকটি রুট তৈরি করা হয়েছে—
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিকল্প রুট একত্রেও হরমুজের সক্ষমতার সমান হতে পারে না।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান—এই জলপথে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল অবাধ থাকতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি—এটি তাদের সার্বভৌম অধিকারভুক্ত অঞ্চল।
এই দুই অবস্থানের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব হবে বিশ্বজুড়ে।
এর মধ্যে থাকতে পারে—
বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি শুধু একটি ভৌগোলিক জলপথ নয়—এটি আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও এই পথ সচল রাখা এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন