দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন জমা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন জমা

জবির সুমিতার যুক্তরাষ্ট্রে সাফল্য, শীর্ষ ৫ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেলেন স্কলারশিপ ও ভর্তি প্রস্তাব

বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন? স্যাট পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ, কত স্কোরে মিলবে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কলারশিপের সুযোগ

প্রেস রিলিজ নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে NUB Film and Photography Club-এর উদ্যোগে ফটোগ্রাফি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

অনার্সে বাংলা-ইতিহাস-দর্শন বন্ধ হচ্ছে না, গুজব উড়িয়ে দিলেন শিক্ষামন্ত্রী

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ২০ জুলাই, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

এইচএসসি ২০২৬: ১৫ জুন থেকে প্রবেশপত্র বিতরণ, ভুল সংশোধনের সুযোগ ২৫ জুন পর্যন্ত

এনসিটিবির বিনা মূল্যের বই ছাপায় ১৮৩ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, নিরীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

বাবার অনুপস্থিতি: শিশুর মানসিক বিকাশে নীরব প্রভাব

বাবার অনুপস্থিতি: শিশুর মানসিক বিকাশে নীরব প্রভাব
-ছবি: সংগৃহীত

পরিবার একটি শিশুর জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষালয়। এই শিক্ষালয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলেন বাবা। একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন—তিনি সন্তানের মানসিক বিকাশ, আচরণ গঠন, আত্মপরিচয় তৈরি এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন দায়িত্বশীল ও সম্পৃক্ত বাবা শিশুর জন্য নিরাপত্তা, স্থিরতা এবং দিকনির্দেশনার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যেসব শিশু নিয়মিত বাবার সান্নিধ্য পায় না, তারা অনেক সময় আবেগগত অস্থিরতা, আচরণগত সমস্যা এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে জটিলতার সম্মুখীন হয়। একটি শিশু কীভাবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করবে, কীভাবে ব্যর্থতা বা চাপ মোকাবিলা করবে এবং কীভাবে আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে—এসব ক্ষেত্রে বাবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অত্যন্ত গভীর।

শিশুর জীবনে বাবার উপস্থিতি তাকে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি দেয়। এই নিরাপত্তাবোধ থেকেই শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তৈরি হয়। বিপরীতে, বাবার অনুপস্থিতি অনেক সময় শিশুর মনে অনিশ্চয়তা, শূন্যতা এবং অপ্রাপ্তির বোধ তৈরি করে। এটি ধীরে ধীরে তার আচরণ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে বাবা একটি সরাসরি রোল মডেল হিসেবে কাজ করেন। তারা বাবার আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং জীবনযাপনের ধরণ থেকে শিক্ষা নেয়। অন্যদিকে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রেও বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বাবার সঙ্গে সম্পর্ক তাদের আত্মসম্মানবোধ, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্পর্কের ধরন নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

এই প্রভাব কেবল শৈশবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কৈশোরে প্রবেশের পর শিশুরা যখন নিজের পরিচয় খুঁজে পেতে শুরু করে, তখন বাবার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি তাদের মানসিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার অনুপস্থিতিতে বড় হওয়া অনেক কিশোর-কিশোরী আত্মবিশ্বাসের অভাব, উদ্বেগ, এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রবাসী বাবাদের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। জীবিকার প্রয়োজনে হাজারো বাবা বিদেশে অবস্থান করেন, যাতে তারা পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। কিন্তু এই ত্যাগের একটি আবেগগত মূল্য রয়েছে। সন্তানরা তাদের বাবার শারীরিক উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের জীবনে একটি গভীর শূন্যতা তৈরি করতে পারে।

প্রবাসী বাবার সন্তানদের ক্ষেত্রে এই অভাব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তারা হয়তো বাবার ভালোবাসা অনুভব করে, কিন্তু সরাসরি সময় কাটানো, একসঙ্গে খেলা করা, সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা—এই গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে অনেক সময় তারা নিজেদের আবেগ প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা এক ধরনের একাকীত্বে ভোগে।

তবে প্রযুক্তির এই যুগে দূরত্ব কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব। নিয়মিত ভিডিও কল, ফোনালাপ, সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনে আগ্রহ দেখানো—এসব উদ্যোগ সন্তানের সঙ্গে বাবার মানসিক বন্ধনকে দৃঢ় রাখতে সাহায্য করে। সন্তানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা, সিদ্ধান্তে তাদের পাশে থাকা—এসবই দূরত্বের প্রভাব কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়াও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মা বা অভিভাবকরা যদি সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন এবং বাবার অনুপস্থিতির বিষয়টি সংবেদনশীলভাবে সামলান, তাহলে শিশুর মানসিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, একজন বাবার উপস্থিতি একটি শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু একজন অভিভাবক নন—তিনি একজন পথপ্রদর্শক, একজন বন্ধু এবং একজন অনুপ্রেরণার উৎস। তাই পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং সন্তানের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো প্রতিটি বাবার জন্য জরুরি।

কারণ, একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশ এবং একটি আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিগুলোর একটি হলো—তার পরিবারের সঙ্গে গভীর, নিরাপদ এবং ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬


বাবার অনুপস্থিতি: শিশুর মানসিক বিকাশে নীরব প্রভাব

প্রকাশের তারিখ : ১২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

পরিবার একটি শিশুর জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষালয়। এই শিক্ষালয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলেন বাবা। একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন—তিনি সন্তানের মানসিক বিকাশ, আচরণ গঠন, আত্মপরিচয় তৈরি এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন দায়িত্বশীল ও সম্পৃক্ত বাবা শিশুর জন্য নিরাপত্তা, স্থিরতা এবং দিকনির্দেশনার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যেসব শিশু নিয়মিত বাবার সান্নিধ্য পায় না, তারা অনেক সময় আবেগগত অস্থিরতা, আচরণগত সমস্যা এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে জটিলতার সম্মুখীন হয়। একটি শিশু কীভাবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করবে, কীভাবে ব্যর্থতা বা চাপ মোকাবিলা করবে এবং কীভাবে আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে—এসব ক্ষেত্রে বাবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অত্যন্ত গভীর।

শিশুর জীবনে বাবার উপস্থিতি তাকে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি দেয়। এই নিরাপত্তাবোধ থেকেই শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তৈরি হয়। বিপরীতে, বাবার অনুপস্থিতি অনেক সময় শিশুর মনে অনিশ্চয়তা, শূন্যতা এবং অপ্রাপ্তির বোধ তৈরি করে। এটি ধীরে ধীরে তার আচরণ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে বাবা একটি সরাসরি রোল মডেল হিসেবে কাজ করেন। তারা বাবার আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং জীবনযাপনের ধরণ থেকে শিক্ষা নেয়। অন্যদিকে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রেও বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বাবার সঙ্গে সম্পর্ক তাদের আত্মসম্মানবোধ, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্পর্কের ধরন নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

এই প্রভাব কেবল শৈশবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কৈশোরে প্রবেশের পর শিশুরা যখন নিজের পরিচয় খুঁজে পেতে শুরু করে, তখন বাবার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি তাদের মানসিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার অনুপস্থিতিতে বড় হওয়া অনেক কিশোর-কিশোরী আত্মবিশ্বাসের অভাব, উদ্বেগ, এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রবাসী বাবাদের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। জীবিকার প্রয়োজনে হাজারো বাবা বিদেশে অবস্থান করেন, যাতে তারা পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। কিন্তু এই ত্যাগের একটি আবেগগত মূল্য রয়েছে। সন্তানরা তাদের বাবার শারীরিক উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের জীবনে একটি গভীর শূন্যতা তৈরি করতে পারে।

প্রবাসী বাবার সন্তানদের ক্ষেত্রে এই অভাব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তারা হয়তো বাবার ভালোবাসা অনুভব করে, কিন্তু সরাসরি সময় কাটানো, একসঙ্গে খেলা করা, সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা—এই গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে অনেক সময় তারা নিজেদের আবেগ প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা এক ধরনের একাকীত্বে ভোগে।

তবে প্রযুক্তির এই যুগে দূরত্ব কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব। নিয়মিত ভিডিও কল, ফোনালাপ, সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনে আগ্রহ দেখানো—এসব উদ্যোগ সন্তানের সঙ্গে বাবার মানসিক বন্ধনকে দৃঢ় রাখতে সাহায্য করে। সন্তানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা, সিদ্ধান্তে তাদের পাশে থাকা—এসবই দূরত্বের প্রভাব কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়াও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মা বা অভিভাবকরা যদি সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন এবং বাবার অনুপস্থিতির বিষয়টি সংবেদনশীলভাবে সামলান, তাহলে শিশুর মানসিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, একজন বাবার উপস্থিতি একটি শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু একজন অভিভাবক নন—তিনি একজন পথপ্রদর্শক, একজন বন্ধু এবং একজন অনুপ্রেরণার উৎস। তাই পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং সন্তানের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো প্রতিটি বাবার জন্য জরুরি।

কারণ, একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশ এবং একটি আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিগুলোর একটি হলো—তার পরিবারের সঙ্গে গভীর, নিরাপদ এবং ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর