দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ বন্ধে নতুন উদ্যোগ, কী বললেন গৃহায়নমন্ত্রী?

অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ বন্ধে নতুন উদ্যোগ, কী বললেন গৃহায়নমন্ত্রী?

সৌদির স্কুলের বইয়ে আমূল পরিবর্তন, ইহুদি-খ্রিস্টানদের নিয়ে বদলে গেল পুরোনো বয়ান

৬ মাস শেষে সরকারের অর্জন-সীমাবদ্ধতা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী, চলছে সূক্ষ্ম মূল্যায়ন

দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে ঢাকা–দিল্লি টানাপোড়েন, সম্পর্ক কি আবার কঠিন পথে?

জ্বালানি খাত নিয়ে বড় সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রীর, নিয়োগ হবে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস: তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে জমজমাট সমাপনী

মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে? ট্রাম্পের কড়া জবাবে চাঞ্চল্য

শারীরিক অসুস্থতায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

জ্বালানি খাত নিয়ে বড় সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রীর, নিয়োগ হবে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী

জ্বালানি খাত নিয়ে বড় সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রীর, নিয়োগ হবে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী
ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর চিকিৎসক সমাবেশে জ্বালানি খাত ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর দাবি, একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয় রয়েছে।

শনিবার সকালে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে শুধু জ্বালানি সংকট নয়, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার, চিকিৎসক নিয়োগ, স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি, ই-হেলথ কার্ড এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল সম্প্রসারণের মতো একাধিক পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।

‘অপরিকল্পিত পরিকল্পনা জ্বালানি খাতকে বিপদের মুখে ফেলেছে’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পেয়েছিল। দুর্বল অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে দেশকে নতুন করে দাঁড় করানোর কাজ চলছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আগের সরকারের সুবিধাভোগীদের একটি অংশ এখনো সক্রিয়। একই সঙ্গে অতীতে নেওয়া অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সরকার এসব সমস্যা চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে ঠিক করার চেষ্টা করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী

তবে জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করার জন্য যে চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাদের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম তিনি প্রকাশ্যে বলেননি। ফলে এ অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জ্বালানি সংকট সামলাতে সরকারের পরিকল্পনা

বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, পরিবহন ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যয় পর্যন্ত জ্বালানির সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়েও দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্যভিত্তিক একটি অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের মার্চ–মে সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি সংকট, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ পরিস্থিতির চাপের কথা উঠে এসেছে।

এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর ‘অস্থিতিশীল করার চক্র’ সংক্রান্ত বক্তব্যের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ রাখা, মজুত ও বিতরণে নজরদারি এবং বাজারে গুজব ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কারণ জ্বালানি নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি কেনার চেষ্টা করতে পারেন। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ থাকলেও সাময়িক সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা

চিকিৎসা খাতের সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ নীতির ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি জানান, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিকিৎসকদের নেতৃত্বে এসব স্বাস্থ্যকর্মী সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে পরামর্শ দেবেন।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালমুখী চাপ কমানোর পাশাপাশি ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এত বড় জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন, তদারকি ও অর্থায়নের কাঠামো স্পষ্ট করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চিকিৎসকদের জন্য একাধিক দাবি বিবেচনার আশ্বাস

ড্যাবের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবি সমাবেশে তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব দাবিকে অযৌক্তিক নয় বলে উল্লেখ করে সরকারের বিবেচনায় রাখার কথা জানান।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে দ্রুত ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ;
  • সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২–৩৪ বছরে উন্নীত করা;
  • চিকিৎসকদের অবসরের বয়সসীমা ৬১–৬৫ বছরে উন্নীত করা;
  • স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন;
  • উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসকদের বিশেষ ভাতা;
  • বেসরকারি খাতের চিকিৎসকদের জন্য নির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতন কাঠামো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব দাবি সরকারের বিবেচনার মধ্যে থাকা উচিত।

তবে দাবি বিবেচনা করা এবং বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। বিশেষ বিসিএস, বয়সসীমা, অবসর বয়স বা নতুন আইন করতে হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিধি, বাজেট ও আইনগত প্রক্রিয়াও প্রয়োজন হবে।

স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের লক্ষ্য

প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়েও কাজ করার কথা বলেন তিনি।

এর পাশাপাশি দ্রুত ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ই-হেলথ কার্ড চালু হলে একজন রোগীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সফলতার জন্য তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, হাসপাতালগুলোর ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজনীতিতে চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য

চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের রাজনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন ও পেশার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ পেশাজীবীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকা অস্বাভাবিক নয়।

তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা না হয়, সে বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এই বক্তব্যের মূল বিষয়টি হলো—পেশাজীবীদের নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার পাশাপাশি রোগীর প্রতি পেশাগত দায়িত্বকেও অগ্রাধিকার দেওয়া। চিকিৎসা পেশায় এর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ একজন চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত সরাসরি রোগীর জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।

গুরুত্বপূর্ণ দিক

  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
  • সরকার ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
  • বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগসহ ড্যাবের বিভিন্ন দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
  • ই-হেলথ কার্ড চালু এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

সাধারণ মানুষের ভাবনা: জ্বালানি ও স্বাস্থ্য—দুটিই সরাসরি জীবনের সঙ্গে যুক্ত

জ্বালানি সংকটের প্রভাব মানুষ সবচেয়ে দ্রুত টের পায় পরিবহন ব্যয়, পণ্যের দাম, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শিল্প উৎপাদনে। আবার স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা সরাসরি পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় ও জীবনমানের ওপর চাপ তৈরি করে।

তাই সরকারের সামনে এখন দুটি বড় কাজ—একদিকে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নেওয়া। এ দুই ক্ষেত্রে শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের গতি এবং স্বচ্ছতাই মানুষের আস্থা তৈরি করবে।

বিশেষ করে জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করার অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকার যদি কোনো চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করে, তাহলে ভবিষ্যতে তদন্তের ফলাফল ও নেওয়া পদক্ষেপ জনগণের সামনে স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে গুজব কমবে এবং প্রকৃত সমস্যা কোথায়, সেটিও পরিষ্কার হবে।

আমাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ: সংকটের পাশাপাশি আস্থার লড়াইও আছে

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে—জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ এবং স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা। দুই ক্ষেত্রের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও দুটির কেন্দ্রে রয়েছে জনআস্থা

জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে মানুষ যদি অনিশ্চয়তায় থাকে, তাহলে গুজব দ্রুত ছড়াতে পারে। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে বড় প্রকল্প বা নিয়োগের ঘোষণা বাস্তবে না এলে মানুষের প্রত্যাশা হতাশায় পরিণত হতে পারে।

তাই জ্বালানি খাতে সরবরাহ, মজুত ও বাজার পরিস্থিতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে প্রশাসনিক কাজের বাস্তব চিত্রও মানুষ দেখতে পারবে।

চিকিৎসক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী সরকারি-বেসরকারি সব চিকিৎসকের সহযোগিতা চেয়ে এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান, যেখানে মানুষ দেশের মধ্যেই মানসম্মত চিকিৎসা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে।

সমাবেশে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

বিষয় : তারেক রহমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশ জ্বালানি খাত বাংলাদেশ ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ তারেক রহমানের বক্তব্য

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬


জ্বালানি খাত নিয়ে বড় সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রীর, নিয়োগ হবে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী

প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর দাবি, একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয় রয়েছে।

শনিবার সকালে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে শুধু জ্বালানি সংকট নয়, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার, চিকিৎসক নিয়োগ, স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি, ই-হেলথ কার্ড এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল সম্প্রসারণের মতো একাধিক পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।

‘অপরিকল্পিত পরিকল্পনা জ্বালানি খাতকে বিপদের মুখে ফেলেছে’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পেয়েছিল। দুর্বল অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে দেশকে নতুন করে দাঁড় করানোর কাজ চলছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আগের সরকারের সুবিধাভোগীদের একটি অংশ এখনো সক্রিয়। একই সঙ্গে অতীতে নেওয়া অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সরকার এসব সমস্যা চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে ঠিক করার চেষ্টা করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী

তবে জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করার জন্য যে চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাদের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম তিনি প্রকাশ্যে বলেননি। ফলে এ অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জ্বালানি সংকট সামলাতে সরকারের পরিকল্পনা

বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, পরিবহন ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যয় পর্যন্ত জ্বালানির সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়েও দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্যভিত্তিক একটি অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের মার্চ–মে সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি সংকট, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ পরিস্থিতির চাপের কথা উঠে এসেছে।

এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর ‘অস্থিতিশীল করার চক্র’ সংক্রান্ত বক্তব্যের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ রাখা, মজুত ও বিতরণে নজরদারি এবং বাজারে গুজব ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কারণ জ্বালানি নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি কেনার চেষ্টা করতে পারেন। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ থাকলেও সাময়িক সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা

চিকিৎসা খাতের সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ নীতির ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি জানান, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিকিৎসকদের নেতৃত্বে এসব স্বাস্থ্যকর্মী সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে পরামর্শ দেবেন।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালমুখী চাপ কমানোর পাশাপাশি ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এত বড় জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন, তদারকি ও অর্থায়নের কাঠামো স্পষ্ট করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চিকিৎসকদের জন্য একাধিক দাবি বিবেচনার আশ্বাস

ড্যাবের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবি সমাবেশে তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব দাবিকে অযৌক্তিক নয় বলে উল্লেখ করে সরকারের বিবেচনায় রাখার কথা জানান।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে দ্রুত ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ;
  • সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২–৩৪ বছরে উন্নীত করা;
  • চিকিৎসকদের অবসরের বয়সসীমা ৬১–৬৫ বছরে উন্নীত করা;
  • স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন;
  • উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসকদের বিশেষ ভাতা;
  • বেসরকারি খাতের চিকিৎসকদের জন্য নির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতন কাঠামো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব দাবি সরকারের বিবেচনার মধ্যে থাকা উচিত।

তবে দাবি বিবেচনা করা এবং বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। বিশেষ বিসিএস, বয়সসীমা, অবসর বয়স বা নতুন আইন করতে হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিধি, বাজেট ও আইনগত প্রক্রিয়াও প্রয়োজন হবে।

স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের লক্ষ্য

প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়েও কাজ করার কথা বলেন তিনি।

এর পাশাপাশি দ্রুত ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ই-হেলথ কার্ড চালু হলে একজন রোগীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সফলতার জন্য তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, হাসপাতালগুলোর ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজনীতিতে চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য

চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের রাজনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন ও পেশার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ পেশাজীবীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকা অস্বাভাবিক নয়।

তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা না হয়, সে বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এই বক্তব্যের মূল বিষয়টি হলো—পেশাজীবীদের নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার পাশাপাশি রোগীর প্রতি পেশাগত দায়িত্বকেও অগ্রাধিকার দেওয়া। চিকিৎসা পেশায় এর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ একজন চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত সরাসরি রোগীর জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।

গুরুত্বপূর্ণ দিক

  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
  • সরকার ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
  • বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগসহ ড্যাবের বিভিন্ন দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
  • ই-হেলথ কার্ড চালু এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

সাধারণ মানুষের ভাবনা: জ্বালানি ও স্বাস্থ্য—দুটিই সরাসরি জীবনের সঙ্গে যুক্ত

জ্বালানি সংকটের প্রভাব মানুষ সবচেয়ে দ্রুত টের পায় পরিবহন ব্যয়, পণ্যের দাম, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শিল্প উৎপাদনে। আবার স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা সরাসরি পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় ও জীবনমানের ওপর চাপ তৈরি করে।

তাই সরকারের সামনে এখন দুটি বড় কাজ—একদিকে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নেওয়া। এ দুই ক্ষেত্রে শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের গতি এবং স্বচ্ছতাই মানুষের আস্থা তৈরি করবে।

বিশেষ করে জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করার অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকার যদি কোনো চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করে, তাহলে ভবিষ্যতে তদন্তের ফলাফল ও নেওয়া পদক্ষেপ জনগণের সামনে স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে গুজব কমবে এবং প্রকৃত সমস্যা কোথায়, সেটিও পরিষ্কার হবে।

আমাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ: সংকটের পাশাপাশি আস্থার লড়াইও আছে

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে—জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ এবং স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা। দুই ক্ষেত্রের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও দুটির কেন্দ্রে রয়েছে জনআস্থা

জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে মানুষ যদি অনিশ্চয়তায় থাকে, তাহলে গুজব দ্রুত ছড়াতে পারে। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে বড় প্রকল্প বা নিয়োগের ঘোষণা বাস্তবে না এলে মানুষের প্রত্যাশা হতাশায় পরিণত হতে পারে।

তাই জ্বালানি খাতে সরবরাহ, মজুত ও বাজার পরিস্থিতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে প্রশাসনিক কাজের বাস্তব চিত্রও মানুষ দেখতে পারবে।

চিকিৎসক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী সরকারি-বেসরকারি সব চিকিৎসকের সহযোগিতা চেয়ে এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান, যেখানে মানুষ দেশের মধ্যেই মানসম্মত চিকিৎসা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে।

সমাবেশে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর