ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ ধোঁয়ায় ঢেকে যায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি অংশ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে। আগুনের সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই নার্সসহ অন্তত পাঁচজন।
বুধবার (২০ মে) ভোরে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের পুরোনো আইসিইউ ইউনিটসংলগ্ন একটি স্টোররুমে আগুন লাগে। আগুন লাগার পর দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার সময় নাসরিন নাহার নামে এক নারী মারা যান বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
নিহত নাসরিন নাহার খুলনার কয়রা উপজেলার নেছার আলীর মেয়ে। তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। আগুনের ধোঁয়া ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালের বারান্দায় নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
একই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন দিঘলিয়া উপজেলার শেখ আবুল হাসেম (৯৬) নামের আরেক রোগীরও মৃত্যু হয়েছে। যদিও হাসপাতাল সূত্র বলছে, আগুন লাগার আগেই ভোর পাঁচটার দিকে তিনি মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোরের দিকে হাসপাতালের চতুর্থ তলা থেকে প্রথমে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। পরে মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ে। রোগীদের স্বজনদের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়। অনেকে আতঙ্কে রোগীদের কোলে কিংবা হুইলচেয়ারে করে নিচে নামাতে থাকেন।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি কী হয়েছে। পরে ধোঁয়া বাড়তে থাকলে সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। আইসিইউর রোগীদের দ্রুত বের করা হচ্ছিল।”
ঘটনার সময় হাসপাতালে দায়িত্বরত কয়েকজন নার্স ও কর্মচারী রোগীদের নিরাপদ স্থানে নিতে গিয়ে আহত হন। আহতদের মধ্যে দুই নার্স রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে তাদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের কারণে হাসপাতালের কিছু আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং স্টোররুমের মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ঠিক কত টাকার ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক স্বজন অভিযোগ করেন, আগুন লাগার পর প্রথম কয়েক মিনিট পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। যদিও হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
খুমেক হাসপাতালের কয়েকজন রোগীর স্বজন দাবি করেন, হাসপাতালের পুরোনো ভবনে বৈদ্যুতিক লাইনের ঝুঁকি নিয়ে আগেও উদ্বেগ ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ভবন, অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, অতিরিক্ত যন্ত্রপাতির চাপ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা তদারকির অভাবকে বিশেষজ্ঞরা বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।
স্বাস্থ্য খাত বিশ্লেষকদের মতে, হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় অগ্নি-নিরাপত্তা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এমন ঝুঁকি থেকেই যায়। আইসিইউ বা জরুরি বিভাগে থাকা রোগীরা সাধারণত নিজেরা নড়াচড়া করতে পারেন না। ফলে আগুন বা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে তাদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, হাসপাতালের মতো জায়গায় হঠাৎ আগুন লাগার ঘটনা শুধু রোগীদের নয়, স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক, অনিদ্রা বা নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দীর্ঘদিন থাকতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগুন লাগার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখছে। বৈদ্যুতিক লাইন, স্টোররুমের সরঞ্জাম এবং আইসিইউ ইউনিটের আশপাশের অবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগুনের উৎস, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং রোগী সরানোর প্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে নাসরিন নাহারের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হাসপাতালের ভোরের সেই আতঙ্ক কয়েক ঘণ্টা পরও স্বাভাবিক হতে পারেননি অনেক রোগী ও স্বজন।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ ধোঁয়ায় ঢেকে যায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি অংশ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে। আগুনের সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই নার্সসহ অন্তত পাঁচজন।
বুধবার (২০ মে) ভোরে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের পুরোনো আইসিইউ ইউনিটসংলগ্ন একটি স্টোররুমে আগুন লাগে। আগুন লাগার পর দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার সময় নাসরিন নাহার নামে এক নারী মারা যান বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
নিহত নাসরিন নাহার খুলনার কয়রা উপজেলার নেছার আলীর মেয়ে। তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। আগুনের ধোঁয়া ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালের বারান্দায় নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
একই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন দিঘলিয়া উপজেলার শেখ আবুল হাসেম (৯৬) নামের আরেক রোগীরও মৃত্যু হয়েছে। যদিও হাসপাতাল সূত্র বলছে, আগুন লাগার আগেই ভোর পাঁচটার দিকে তিনি মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোরের দিকে হাসপাতালের চতুর্থ তলা থেকে প্রথমে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। পরে মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ে। রোগীদের স্বজনদের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়। অনেকে আতঙ্কে রোগীদের কোলে কিংবা হুইলচেয়ারে করে নিচে নামাতে থাকেন।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি কী হয়েছে। পরে ধোঁয়া বাড়তে থাকলে সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। আইসিইউর রোগীদের দ্রুত বের করা হচ্ছিল।”
ঘটনার সময় হাসপাতালে দায়িত্বরত কয়েকজন নার্স ও কর্মচারী রোগীদের নিরাপদ স্থানে নিতে গিয়ে আহত হন। আহতদের মধ্যে দুই নার্স রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে তাদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের কারণে হাসপাতালের কিছু আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং স্টোররুমের মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ঠিক কত টাকার ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক স্বজন অভিযোগ করেন, আগুন লাগার পর প্রথম কয়েক মিনিট পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। যদিও হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
খুমেক হাসপাতালের কয়েকজন রোগীর স্বজন দাবি করেন, হাসপাতালের পুরোনো ভবনে বৈদ্যুতিক লাইনের ঝুঁকি নিয়ে আগেও উদ্বেগ ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ভবন, অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, অতিরিক্ত যন্ত্রপাতির চাপ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা তদারকির অভাবকে বিশেষজ্ঞরা বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।
স্বাস্থ্য খাত বিশ্লেষকদের মতে, হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় অগ্নি-নিরাপত্তা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এমন ঝুঁকি থেকেই যায়। আইসিইউ বা জরুরি বিভাগে থাকা রোগীরা সাধারণত নিজেরা নড়াচড়া করতে পারেন না। ফলে আগুন বা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে তাদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, হাসপাতালের মতো জায়গায় হঠাৎ আগুন লাগার ঘটনা শুধু রোগীদের নয়, স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক, অনিদ্রা বা নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দীর্ঘদিন থাকতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগুন লাগার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখছে। বৈদ্যুতিক লাইন, স্টোররুমের সরঞ্জাম এবং আইসিইউ ইউনিটের আশপাশের অবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগুনের উৎস, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং রোগী সরানোর প্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে নাসরিন নাহারের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হাসপাতালের ভোরের সেই আতঙ্ক কয়েক ঘণ্টা পরও স্বাভাবিক হতে পারেননি অনেক রোগী ও স্বজন।

আপনার মতামত লিখুন