রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনছে পুলিশ। মাত্র সাত বছরের একটি শিশুকে ঘিরে এমন নৃশংসতার ঘটনায় স্তব্ধ পুরো দেশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি নগরজীবনের ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতারও নির্মম উদাহরণ।
পুলিশের দাবি, রামিসার মা যখন পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় বারবার কড়া নাড়ছিলেন, তখন ভেতরে চলছিল হত্যাকাণ্ডের পর আলামত গোপনের চেষ্টা। আর মূল অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেই দরজা খুলতে দেরি করেন তার স্ত্রী স্বপ্না।
মঙ্গলবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী স্বপ্না ঘটনাটির সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাকে এবং তার স্বামী জাকিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, নিহত রামিসার পরিবার প্রায় ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে বসবাস করছিল। পরিচিত পরিবেশ আর দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্কের মধ্যেই বড় হচ্ছিল শিশুটি। কিন্তু মাত্র দুই মাস আগে বিপরীত পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসে জাকির ও তার স্ত্রী স্বপ্না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নতুন এই দম্পতি খুব একটা মিশুক ছিলেন না। ভবনের অনেক বাসিন্দাই তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানতেন না। পুলিশ বলছে, জাকির পেশায় রিকশা মেকানিক হলেও তার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযুক্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরেই বিকৃত মানসিকতা বহন করছিল। রামিসা তার শিকার হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও কেমিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার সকালে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু হঠাৎ তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা ভবনের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে রামিসার মা পাশের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির স্যান্ডেল দেখতে পান। তখনই সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি দরজায় বারবার নক করতে থাকেন। কিন্তু অনেকক্ষণ দরজা খোলা হয়নি।
পুলিশের ভাষ্যমতে, এই সময়ের মধ্যেই জাকির জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে নিশ্চিত হওয়ার পর দরজা খোলেন স্বপ্না।
ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা উপস্থিত সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলে। খাটের নিচে পাওয়া যায় রামিসার মস্তকবিহীন দেহ। পরে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় বিচ্ছিন্ন মাথা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, আলামত গোপন ও মরদেহ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যেই শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার পরপরই অভিযান শুরু করে পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, পালিয়ে যাওয়া জাকির নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছে। অভিযোগ রয়েছে, সে তার এক বন্ধুর মাধ্যমে পাঠানো টাকা তুলতে একটি বিকাশের দোকানে যায়।
পরে স্থানীয় পুলিশ ও দোকান কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যেই পুরো ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচন সম্ভব হয়েছে।
এদিকে, পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলার প্রক্রিয়া চলছে। রামিসার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে শিশু নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহুরে জীবনে ‘পরিচিত মানুষই নিরাপদ’— এই ধারণা অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে পড়ছে। একই ভবনে থাকা বা প্রতিবেশী হওয়া মানেই যে নিরাপদ সম্পর্ক, বাস্তবে তার নিশ্চয়তা নেই।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা ও বিকৃত আচরণের ঘটনা বাড়লেও অনেক পরিবার এখনো সচেতন নয়। শিশুদের ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’, অপরিচিত আচরণ বা হুমকির বিষয়ে নিয়মিত শেখানো প্রয়োজন বলে মত তাদের।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক অপরাধী বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও ভেতরে ভয়ংকর মানসিক বিকৃতি লুকিয়ে রাখতে পারে। ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নয়, পরিবার ও সমাজকেও আরও সতর্ক হতে হবে।
এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। রামিসাকে কীভাবে ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়েছিল? হত্যার আগে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল কি না? অভিযুক্তদের পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল, নাকি ঘটনাটি আকস্মিক?
পুলিশ বলছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব তথ্য নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার— রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে এক মুহূর্তের অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনছে পুলিশ। মাত্র সাত বছরের একটি শিশুকে ঘিরে এমন নৃশংসতার ঘটনায় স্তব্ধ পুরো দেশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি নগরজীবনের ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতারও নির্মম উদাহরণ।
পুলিশের দাবি, রামিসার মা যখন পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় বারবার কড়া নাড়ছিলেন, তখন ভেতরে চলছিল হত্যাকাণ্ডের পর আলামত গোপনের চেষ্টা। আর মূল অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেই দরজা খুলতে দেরি করেন তার স্ত্রী স্বপ্না।
মঙ্গলবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী স্বপ্না ঘটনাটির সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাকে এবং তার স্বামী জাকিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, নিহত রামিসার পরিবার প্রায় ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে বসবাস করছিল। পরিচিত পরিবেশ আর দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্কের মধ্যেই বড় হচ্ছিল শিশুটি। কিন্তু মাত্র দুই মাস আগে বিপরীত পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসে জাকির ও তার স্ত্রী স্বপ্না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নতুন এই দম্পতি খুব একটা মিশুক ছিলেন না। ভবনের অনেক বাসিন্দাই তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানতেন না। পুলিশ বলছে, জাকির পেশায় রিকশা মেকানিক হলেও তার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযুক্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরেই বিকৃত মানসিকতা বহন করছিল। রামিসা তার শিকার হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও কেমিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার সকালে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু হঠাৎ তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা ভবনের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে রামিসার মা পাশের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির স্যান্ডেল দেখতে পান। তখনই সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি দরজায় বারবার নক করতে থাকেন। কিন্তু অনেকক্ষণ দরজা খোলা হয়নি।
পুলিশের ভাষ্যমতে, এই সময়ের মধ্যেই জাকির জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে নিশ্চিত হওয়ার পর দরজা খোলেন স্বপ্না।
ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা উপস্থিত সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলে। খাটের নিচে পাওয়া যায় রামিসার মস্তকবিহীন দেহ। পরে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় বিচ্ছিন্ন মাথা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, আলামত গোপন ও মরদেহ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যেই শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার পরপরই অভিযান শুরু করে পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, পালিয়ে যাওয়া জাকির নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছে। অভিযোগ রয়েছে, সে তার এক বন্ধুর মাধ্যমে পাঠানো টাকা তুলতে একটি বিকাশের দোকানে যায়।
পরে স্থানীয় পুলিশ ও দোকান কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যেই পুরো ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচন সম্ভব হয়েছে।
এদিকে, পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলার প্রক্রিয়া চলছে। রামিসার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে শিশু নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহুরে জীবনে ‘পরিচিত মানুষই নিরাপদ’— এই ধারণা অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে পড়ছে। একই ভবনে থাকা বা প্রতিবেশী হওয়া মানেই যে নিরাপদ সম্পর্ক, বাস্তবে তার নিশ্চয়তা নেই।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা ও বিকৃত আচরণের ঘটনা বাড়লেও অনেক পরিবার এখনো সচেতন নয়। শিশুদের ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’, অপরিচিত আচরণ বা হুমকির বিষয়ে নিয়মিত শেখানো প্রয়োজন বলে মত তাদের।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক অপরাধী বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও ভেতরে ভয়ংকর মানসিক বিকৃতি লুকিয়ে রাখতে পারে। ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নয়, পরিবার ও সমাজকেও আরও সতর্ক হতে হবে।
এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। রামিসাকে কীভাবে ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়েছিল? হত্যার আগে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল কি না? অভিযুক্তদের পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল, নাকি ঘটনাটি আকস্মিক?
পুলিশ বলছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব তথ্য নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার— রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে এক মুহূর্তের অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন