সাতক্ষীরার বিখ্যাত হিমসাগর আম আবারও পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। চলতি মৌসুমে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের একাধিক দেশে এ জেলার আম রপ্তানির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়তে থাকায় স্থানীয় আমচাষি ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার সাতক্ষীরায় প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। মৌসুমজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রথম ধাপে দেড় টনের মতো হিমসাগর আম লন্ডন ও ইতালির উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। পুরো মৌসুমে প্রায় ১০০ টন হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সাতক্ষীরার আম দ্রুত পাকে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এখানকার মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য বেশ অনুকূল হওয়ায় ফলের স্বাদ ও গুণগত মানেও আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। বিশেষ করে হিমসাগর আমের মিষ্টতা, আঁশবিহীন গঠন এবং উজ্জ্বল রং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে নিয়মিতভাবে সাতক্ষীরার আম বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। প্রতি বছরই রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা করে বাড়ছে। স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, আগে যেখানে আম বিক্রি পুরোপুরি দেশীয় বাজারের ওপর নির্ভর করত, এখন বিদেশি বাজার যুক্ত হওয়ায় তারা বাড়তি দাম ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগ পাচ্ছেন।
বিদেশে পাঠানোর জন্য আম উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় আলাদা সতর্কতা অনুসরণ করতে হয়। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কাঁঠালতলা এলাকার আমচাষি হাফিজুর রহমান খোকা জানান, রপ্তানির উপযোগী আম তৈরি করতে শুরু থেকেই পরিকল্পিত পরিচর্যা করতে হয়।
তিনি বলেন, গাছে নিয়মিত সেচ দেওয়া, ডাল ছাঁটাই, পরিমিত সার ব্যবহার এবং ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত ও নিরাপদ কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। পুরো বাগান পর্যবেক্ষণে রাখেন রপ্তানিকারকরাও।
তার ভাষায়, “বিদেশে যে আম যায়, সেটার মান ঠিক রাখতে অনেক বেশি খেয়াল রাখতে হয়। ছোট একটা ত্রুটিও পুরো চালান ফেরত পাঠানোর কারণ হতে পারে।”
হাফিজুর রহমান আরও জানান, এবার ফলন মোটামুটি ভালো হলেও কিছু আমের আকার তুলনামূলক ছোট হয়েছে। তবে রপ্তানিযোগ্য আম স্থানীয় বাজারের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা চাষিদের জন্য ইতিবাচক দিক।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার চেইন ইন্টারন্যাশনালের কো-অর্ডিনেটর মো. রাসেল বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের আমের পরিচিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরার হিমসাগর আম আলাদা চাহিদা তৈরি করেছে।
তিনি জানান, বাগান থেকে আম সংগ্রহের সময়ই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। পরে ঢাকার প্যাকেজিং সেন্টারে নিয়ে পুনরায় মান যাচাই করা হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহ, জীবাণুমুক্তকরণ এবং বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণের পর বিমানে করে বিদেশে পাঠানো হয়।
মো. রাসেলের দাবি, “শনিবার প্রথম ধাপে দেড় টন আম লন্ডন ও ইতালিতে পাঠানো হয়েছে। পুরো মৌসুমে প্রায় ১০০ টন আম রপ্তানির আশা করছি।”
রপ্তানিকারকদের মতে, ইউরোপের বাজারে টিকে থাকতে হলে মান নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। কারণ বিদেশি ক্রেতারা রাসায়নিকমুক্ত ও নিরাপদ ফলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হতে পারে। স্থানীয় অর্থনীতিতে আম এখন বড় একটি খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, রপ্তানিযোগ্য আমের ক্ষেত্রে কেমিক্যালমুক্ত উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করতে না পারেন, সে জন্য কৃষি বিভাগ নিয়মিত তদারকি করছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি চাষিদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সাতক্ষীরার আম রপ্তানি শুধু চাষিদের জন্য নয়, স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মৌসুম ঘিরে বাগান শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, প্যাকেজিং শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় বাড়ছে। বিশেষ করে বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় জেলার আমের আলাদা ব্র্যান্ড মূল্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবহন সুবিধা আরও উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষকরা আধুনিক ও নিরাপদ কৃষি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহ পান। সাতক্ষীরার হিমসাগর আমের বিদেশ যাত্রা সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ হয়ে উঠছে।
বর্তমানে ইউরোপের বাজারে পাঠানো প্রথম চালান সফলভাবে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছেন চাষি ও রপ্তানিকারকরা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও বড় পরিসরে আম রপ্তানির কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
সাতক্ষীরার বিখ্যাত হিমসাগর আম আবারও পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। চলতি মৌসুমে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের একাধিক দেশে এ জেলার আম রপ্তানির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়তে থাকায় স্থানীয় আমচাষি ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার সাতক্ষীরায় প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। মৌসুমজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রথম ধাপে দেড় টনের মতো হিমসাগর আম লন্ডন ও ইতালির উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। পুরো মৌসুমে প্রায় ১০০ টন হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সাতক্ষীরার আম দ্রুত পাকে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এখানকার মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য বেশ অনুকূল হওয়ায় ফলের স্বাদ ও গুণগত মানেও আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। বিশেষ করে হিমসাগর আমের মিষ্টতা, আঁশবিহীন গঠন এবং উজ্জ্বল রং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে নিয়মিতভাবে সাতক্ষীরার আম বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। প্রতি বছরই রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা করে বাড়ছে। স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, আগে যেখানে আম বিক্রি পুরোপুরি দেশীয় বাজারের ওপর নির্ভর করত, এখন বিদেশি বাজার যুক্ত হওয়ায় তারা বাড়তি দাম ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগ পাচ্ছেন।
বিদেশে পাঠানোর জন্য আম উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় আলাদা সতর্কতা অনুসরণ করতে হয়। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কাঁঠালতলা এলাকার আমচাষি হাফিজুর রহমান খোকা জানান, রপ্তানির উপযোগী আম তৈরি করতে শুরু থেকেই পরিকল্পিত পরিচর্যা করতে হয়।
তিনি বলেন, গাছে নিয়মিত সেচ দেওয়া, ডাল ছাঁটাই, পরিমিত সার ব্যবহার এবং ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত ও নিরাপদ কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। পুরো বাগান পর্যবেক্ষণে রাখেন রপ্তানিকারকরাও।
তার ভাষায়, “বিদেশে যে আম যায়, সেটার মান ঠিক রাখতে অনেক বেশি খেয়াল রাখতে হয়। ছোট একটা ত্রুটিও পুরো চালান ফেরত পাঠানোর কারণ হতে পারে।”
হাফিজুর রহমান আরও জানান, এবার ফলন মোটামুটি ভালো হলেও কিছু আমের আকার তুলনামূলক ছোট হয়েছে। তবে রপ্তানিযোগ্য আম স্থানীয় বাজারের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা চাষিদের জন্য ইতিবাচক দিক।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার চেইন ইন্টারন্যাশনালের কো-অর্ডিনেটর মো. রাসেল বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের আমের পরিচিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরার হিমসাগর আম আলাদা চাহিদা তৈরি করেছে।
তিনি জানান, বাগান থেকে আম সংগ্রহের সময়ই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। পরে ঢাকার প্যাকেজিং সেন্টারে নিয়ে পুনরায় মান যাচাই করা হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহ, জীবাণুমুক্তকরণ এবং বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণের পর বিমানে করে বিদেশে পাঠানো হয়।
মো. রাসেলের দাবি, “শনিবার প্রথম ধাপে দেড় টন আম লন্ডন ও ইতালিতে পাঠানো হয়েছে। পুরো মৌসুমে প্রায় ১০০ টন আম রপ্তানির আশা করছি।”
রপ্তানিকারকদের মতে, ইউরোপের বাজারে টিকে থাকতে হলে মান নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। কারণ বিদেশি ক্রেতারা রাসায়নিকমুক্ত ও নিরাপদ ফলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হতে পারে। স্থানীয় অর্থনীতিতে আম এখন বড় একটি খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, রপ্তানিযোগ্য আমের ক্ষেত্রে কেমিক্যালমুক্ত উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করতে না পারেন, সে জন্য কৃষি বিভাগ নিয়মিত তদারকি করছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি চাষিদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সাতক্ষীরার আম রপ্তানি শুধু চাষিদের জন্য নয়, স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মৌসুম ঘিরে বাগান শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, প্যাকেজিং শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় বাড়ছে। বিশেষ করে বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় জেলার আমের আলাদা ব্র্যান্ড মূল্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবহন সুবিধা আরও উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষকরা আধুনিক ও নিরাপদ কৃষি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহ পান। সাতক্ষীরার হিমসাগর আমের বিদেশ যাত্রা সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ হয়ে উঠছে।
বর্তমানে ইউরোপের বাজারে পাঠানো প্রথম চালান সফলভাবে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছেন চাষি ও রপ্তানিকারকরা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও বড় পরিসরে আম রপ্তানির কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন