দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

চট্টগ্রাম কাস্টমসে এনওসি ছাড়া পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ২৮ টন রক সল্ট আটকে দেওয়া হলো

চট্টগ্রাম কাস্টমসে এনওসি ছাড়া পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ২৮ টন রক সল্ট আটকে দেওয়া হলো

ইউরোপের বাজারে আবারও সাতক্ষীরার হিমসাগর আম, চাষি-রপ্তানিকারকদের চোখে নতুন সম্ভাবনা

তিন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহে এগোচ্ছে মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্প, চালু হতে পারে বছরের শেষে

হরমুজ সংকটের মধ্যেই ভারত-আমিরাত ঘনিষ্ঠতা, ৩ কোটি ব্যারেল তেল মজুত ও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ চুক্তি

স্বর্ণের বাজারে বড় ধাক্কা: এক ভরিতে কমলো ৪ হাজার টাকার বেশি, নতুন দামে চাপে জুয়েলারি বাজার

বাংলাদেশ-চীন বিনিয়োগে ‘উইন-উইন’ সম্ভাবনা, সবুজ শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান

এআই ও স্মার্ট মার্কেটিংয়ে বদলাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত, রাজধানীতে হেলথ অ্যান্ড ওয়েল বিয়িং মার্কেটিং ফেস্ট

গরুর মাংস আমদানির দাবি জোরালো, খামারিদের সুরক্ষায় আপাতত অনড় সরকার

তিন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহে এগোচ্ছে মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্প, চালু হতে পারে বছরের শেষে

তিন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহে এগোচ্ছে মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্প, চালু হতে পারে বছরের শেষে
মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে স্থাপিত এসপিএম অবকাঠামো দিয়ে দ্রুত জ্বালানি খালাসের প্রস্তুতি চলছে। -ছবি: সংগৃহীত

মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে জ্বালানি তেল খালাসের জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প অবশেষে সচল হওয়ার পথে কিছুটা এগিয়েছে। দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকার পর এবার পরিচালনাকারী ঠিকাদার নিয়োগে তিনটি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ পাওয়া গেছে। তবে সব ধরনের মূল্যায়ন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হতে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বছর পরও এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে সরকারের প্রত্যাশিত অর্থ সাশ্রয় ও দ্রুত জ্বালানি সরবরাহের সুফল এখনো পুরোপুরি মিলছে না।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন আশার ইঙ্গিত

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এবার তিনটি প্রতিষ্ঠান এসপিএম পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে।


এর আগে একাধিকবার অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা থেমে যায়। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক দরপত্রেও পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া বাতিল হয়েছিল। ফলে প্রকল্প চালু নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এবার আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা আশাবাদী। তবে কারিগরি যাচাই, আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং চুক্তি প্রক্রিয়া শেষ করতেই আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই এসপিএম প্রকল্প

মহেশখালীর উপকূল থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে স্থাপন করা হয়েছে ভাসমান মুরিং ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে অবস্থান করা বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল খালাস করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বড় জাহাজ থেকে ছোট ট্যাংকারে তেল এনে পরে তা রিফাইনারিতে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ার পাশাপাশি ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণও বলে দীর্ঘদিন অভিযোগ রয়েছে।

এসপিএম চালু হলে ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মাত্র দুই দিনের মধ্যে খালাস করা যাবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে সময় লাগে ৮ থেকে ১০ দিন। একইভাবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন ডিজেলও ২৮ ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির থাকার সময়ে দ্রুত ও কম খরচে তেল খালাসের সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে।

নির্মাণ শেষ, কিন্তু চালুতে জটিলতা

প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। ওই সময় সৌদি আরব থেকে আসা ‘এমটি হোরা’ নামের জাহাজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে অপরিশোধিত তেল খালাস করা হয়। পরে ২০২৪ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল সরবরাহ শুরু হয়।

তবে প্রকল্পটি চালু রাখার জন্য স্থায়ী অপারেটর নিয়োগ নিয়ে তখন থেকেই জটিলতা তৈরি হয়। বাস্তবায়নকারী চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি) কিছু সময় পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও পরে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তারা সরে যায়।


এরপর বিপিসি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কাঠামো গড়ে না ওঠায় প্রকল্পটি পুরো সক্ষমতায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি

প্রকল্পটির শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্যয় ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্নও ওঠে। সমালোচকরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, বৈশ্বিক বাজারে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে খরচ বেড়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, এসপিএম চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রকল্পটি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় সেই আর্থিক সুফল এখনো বাস্তবে আসেনি।

দুর্ঘটনার পর বাড়ে উদ্বেগ

প্রচলিত পদ্ধতিতে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় আসে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। সে সময় ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ নামের একটি ট্যাংকার থেকে তেল খালাসের সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন নিহত হন।

ওই ঘটনার পর দ্রুত এসপিএম চালুর দাবি আরও জোরালো হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধুনিক অবকাঠামো ব্যবহার না করলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যাবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনেও থমকে যায় প্রক্রিয়া

বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগের সরকারের সময় দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় একটি প্রতিষ্ঠানকে অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হলেও পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ না থাকায় তা বাতিল করা হয়। এরপর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে আবার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নীতিগত ধারাবাহিকতা না থাকলে বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এসপিএম প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।

কী আছে এই প্রকল্পে

এসপিএম প্রকল্পের আওতায় মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। সমুদ্রের নিচ দিয়ে প্রায় ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে, যা মহেশখালী থেকে পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত বিস্তৃত।

এ ছাড়া প্রকল্পে রয়েছে বিশাল স্টোরেজ ট্যাংক, পাম্পিং স্টেশন, বুস্টার পাম্প, জেনারেটর এবং ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের পৃথক ব্যবস্থা।


সামনে কী অপেক্ষা করছে

দরপত্র প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এসপিএম পুরোপুরি চালু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না— দক্ষ পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ প্রকল্পটি কেবল একটি জ্বালানি স্থাপনা নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

বিষয় : এসপিএম প্রকল্প, মহেশখালী জ্বালানি তেল ইস্টার্ন রিফাইনারি

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


তিন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহে এগোচ্ছে মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্প, চালু হতে পারে বছরের শেষে

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে জ্বালানি তেল খালাসের জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প অবশেষে সচল হওয়ার পথে কিছুটা এগিয়েছে। দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকার পর এবার পরিচালনাকারী ঠিকাদার নিয়োগে তিনটি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ পাওয়া গেছে। তবে সব ধরনের মূল্যায়ন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হতে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বছর পরও এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে সরকারের প্রত্যাশিত অর্থ সাশ্রয় ও দ্রুত জ্বালানি সরবরাহের সুফল এখনো পুরোপুরি মিলছে না।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন আশার ইঙ্গিত

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এবার তিনটি প্রতিষ্ঠান এসপিএম পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে।


এর আগে একাধিকবার অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা থেমে যায়। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক দরপত্রেও পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া বাতিল হয়েছিল। ফলে প্রকল্প চালু নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এবার আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা আশাবাদী। তবে কারিগরি যাচাই, আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং চুক্তি প্রক্রিয়া শেষ করতেই আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই এসপিএম প্রকল্প

মহেশখালীর উপকূল থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে স্থাপন করা হয়েছে ভাসমান মুরিং ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে অবস্থান করা বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল খালাস করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বড় জাহাজ থেকে ছোট ট্যাংকারে তেল এনে পরে তা রিফাইনারিতে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ার পাশাপাশি ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণও বলে দীর্ঘদিন অভিযোগ রয়েছে।

এসপিএম চালু হলে ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মাত্র দুই দিনের মধ্যে খালাস করা যাবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে সময় লাগে ৮ থেকে ১০ দিন। একইভাবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন ডিজেলও ২৮ ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির থাকার সময়ে দ্রুত ও কম খরচে তেল খালাসের সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে।

নির্মাণ শেষ, কিন্তু চালুতে জটিলতা

প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। ওই সময় সৌদি আরব থেকে আসা ‘এমটি হোরা’ নামের জাহাজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে অপরিশোধিত তেল খালাস করা হয়। পরে ২০২৪ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল সরবরাহ শুরু হয়।

তবে প্রকল্পটি চালু রাখার জন্য স্থায়ী অপারেটর নিয়োগ নিয়ে তখন থেকেই জটিলতা তৈরি হয়। বাস্তবায়নকারী চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি) কিছু সময় পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও পরে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তারা সরে যায়।


এরপর বিপিসি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কাঠামো গড়ে না ওঠায় প্রকল্পটি পুরো সক্ষমতায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি

প্রকল্পটির শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্যয় ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্নও ওঠে। সমালোচকরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, বৈশ্বিক বাজারে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে খরচ বেড়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, এসপিএম চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রকল্পটি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় সেই আর্থিক সুফল এখনো বাস্তবে আসেনি।

দুর্ঘটনার পর বাড়ে উদ্বেগ

প্রচলিত পদ্ধতিতে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় আসে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। সে সময় ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ নামের একটি ট্যাংকার থেকে তেল খালাসের সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন নিহত হন।

ওই ঘটনার পর দ্রুত এসপিএম চালুর দাবি আরও জোরালো হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধুনিক অবকাঠামো ব্যবহার না করলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যাবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনেও থমকে যায় প্রক্রিয়া

বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগের সরকারের সময় দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় একটি প্রতিষ্ঠানকে অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হলেও পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ না থাকায় তা বাতিল করা হয়। এরপর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে আবার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নীতিগত ধারাবাহিকতা না থাকলে বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এসপিএম প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।

কী আছে এই প্রকল্পে

এসপিএম প্রকল্পের আওতায় মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। সমুদ্রের নিচ দিয়ে প্রায় ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে, যা মহেশখালী থেকে পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত বিস্তৃত।

এ ছাড়া প্রকল্পে রয়েছে বিশাল স্টোরেজ ট্যাংক, পাম্পিং স্টেশন, বুস্টার পাম্প, জেনারেটর এবং ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের পৃথক ব্যবস্থা।


সামনে কী অপেক্ষা করছে

দরপত্র প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এসপিএম পুরোপুরি চালু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না— দক্ষ পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ প্রকল্পটি কেবল একটি জ্বালানি স্থাপনা নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর