ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, ‘প্রকৃত গরিবরা বাদ পড়ছেন’ বললেন ডেপুটি স্পিকার
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোণা-১ আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামাল দাবি করেছেন, প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। তার ভাষায়, এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি মানবিক উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো ঘটনা।রোববার (১৭ মে) সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘চাষাভূষার সন্তান’ গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা ও করণীয় শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব অভিযোগ করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নেত্রকোণা সাংবাদিক ফোরাম।‘ভুয়া নাম ঢুকেছে তালিকায়’সেমিনারে বক্তব্যের শুরুতেই ডেপুটি স্পিকার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি মূলত নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1352]তার দাবি, তালিকা তৈরির সময় অনেক এলাকায় প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে অস্বচ্ছ উপায়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই ধরনের কার্যক্রম মানুষের আস্থা ও রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। সেখানে অনিয়ম হলে ক্ষতিটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও।”যদিও এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি।হাওড় উন্নয়ন নিয়েও ক্ষোভসেমিনারে ফ্যামিলি কার্ডের অনিয়মের পাশাপাশি দেশের হাওড় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা নিয়েও কথা বলেন কায়সার কামাল। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর থেকে হাওড় এলাকার উন্নয়নের নামে নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তব চিত্রে স্থায়ী সমাধান হয়নি।তার ভাষ্য অনুযায়ী, মৎস্যসম্পদ ও জলাভূমি ব্যবস্থাপনার নামে বিভিন্ন সময় ইজারা ও লিজকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা স্থানীয় সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতির চেয়ে সরকারি নথিতে কম তথ্য দেখানো হয়।ডেপুটি স্পিকারের মতে, হাওড় অঞ্চলে প্রতিবছর বন্যা, ফসলহানি, নদীভাঙন ও যোগাযোগ সংকটের মতো সমস্যা থাকলেও সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা দেখা যায় না। এ কারণে কৃষক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছে।বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের দাবিহাওড় এলাকার সমস্যা সমাধানে দ্রুত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বানও জানান তিনি। তার মতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।[TECHTARANGA-POST:1335]তিনি বলেন, স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব না দিলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন বক্তাও হাওড় অঞ্চলের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তবে তারা কেউ সরাসরি প্রশাসনের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেননি।নির্বাচনী এলাকাতেও একই অভিযোগএর আগেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন ডেপুটি স্পিকার। শনিবার (১৬ মে) নেত্রকোণায় নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রথম ধাপের ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক করে বলেন, দায়িত্বে অবহেলা বা নিয়ম না মেনে কাজ করাও এক ধরনের দুর্নীতি।তিনি উল্লেখ করেন, শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করাই অপরাধ নয়; রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করলে সেটিও জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করে। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে পারে।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গেও কথা বলে জানা গেছে, কিছু এলাকায় প্রকৃত দরিদ্র পরিবার ফ্যামিলি কার্ড না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও তুলনামূলক স্বচ্ছল ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে বাড়ছে প্রশ্নবাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য স্বল্পমূল্যে সরবরাহের লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম চালু করা হয়। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির সময়ে এই কর্মসূচি অনেক পরিবারের জন্য সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1327]তবে তালিকা প্রণয়ন, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়ম এবং অস্বচ্ছ বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সামান্য অনিয়মও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের হতাশা তৈরি করতে পারে। কারণ এসব সুবিধার সঙ্গে সরাসরি মানুষের খাদ্য ও জীবনযাত্রার প্রশ্ন জড়িত।তারা বলছেন, প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। একইসঙ্গে অভিযোগ যাচাই ও দ্রুত সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।এখন নজর তদন্ত ও জবাবদিহিতায়ডেপুটি স্পিকারের প্রকাশ্য অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে কোনো তদন্ত কমিটি বা অনুসন্ধানের ঘোষণা এখনো আসেনি, তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তথ্য যাচাই, নিয়মিত অডিট এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার যাতে বাদ না পড়ে, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।