যমুনার ভাঙন রোধে টাঙ্গাইলে ৫০ কোটি টাকার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ শুরু আগামী অর্থবছরে
যমুনার ভাঙনে দিশেহারা মানুষ, অবশেষে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাসটাঙ্গাইল সদর উপজেলার যমুনাপাড়ের মানুষ বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। একেকটি বর্ষা এলেই ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তা—সবকিছু গিলে খায় যমুনা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই এবার আশার কথা শোনালেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছর থেকেই টাঙ্গাইলের ভাঙনকবলিত এলাকায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হবে। সরকারের এই উদ্যোগে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।[TECHTARANGA-POST:1440]শুক্রবার দুপুরে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নের চরপৌলি এলাকার ভাঙনকবলিত অংশ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন পানিসম্পদমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। পরে নদীতীরবর্তী মিন্টু মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তাঁরা।‘দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের পথে’মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ বারবার ঘর হারাচ্ছে, কৃষিজমি হারাচ্ছে, অনেকে বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে স্থায়ী মুক্তি দিতেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।মন্ত্রী জানান, স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার কথা বিবেচনায় নিয়েই স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকেই কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।তিনি আরও বলেন, সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছে এবং যমুনাপাড়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সেই পরিকল্পনার অংশ। পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র দেখতে তিনি সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শনে এসেছেন বলেও জানান।ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে ঘর, জমি আর জীবিকাস্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যমুনার ভাঙন নতুন কোনো সমস্যা নয়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীর তীব্র স্রোতে নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। অনেক পরিবার কয়েকবার পর্যন্ত ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন।চরপৌলি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, অতীতেও একাধিকবার নদীশাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কাজ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নতুন ঘোষণার পরও অনেকে সতর্ক আশাবাদী অবস্থানে রয়েছেন। তবে মন্ত্রীদের সরাসরি এলাকা পরিদর্শন ও নির্দিষ্ট সময়সীমার ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি করেছে।স্থানীয় কৃষকরাও বলছেন, শুধু বসতভিটা নয়, নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে এলাকার অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনেও চাপ তৈরি হচ্ছে।‘আমরা যা বলি, তা-ই করি’অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, নির্বাচনের আগে যমুনার ভাঙন রোধে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং সরকার এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।তিনি বলেন, নদীভাঙন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। তাই শুধু বেড়িবাঁধ নয়, এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1425]প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।কেন বাড়ছে নদীভাঙনের ঝুঁকি?বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অপরিকল্পিত ড্রেজিং এবং পলি জমার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। যমুনা নদী বিশেষভাবে অস্থির প্রকৃতির হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে এর গতিপথ দ্রুত বদলে যায়।নদীভাঙনের কারণে শুধু সম্পদহানি নয়, সামাজিক সংকটও তৈরি হয়। অনেক পরিবার ভূমিহীন হয়ে শহরমুখী হয়। এতে বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকায় জনসংখ্যার চাপ বাড়ে। শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, পরিবারে মানসিক চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্র আরও গভীর হয়।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বারবার ঘর হারানোর অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে। ফলে নদীভাঙনকে শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি মানবিক ও সামাজিক সংকটও।মাঠে ছিলেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাএ সময় উপস্থিত ছিলেন টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শরীফা হক, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শামসুল আলম সরকার, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. শাহজাহান সিরাজসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীন, সাবেক সদস্যসচিব মাহমুদুল হক সানু, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজগর আলী, জেলা যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি খন্দকার আহমেদুল হক সাতিল, সদর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজিম উদ্দিন বিপ্লবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।[TECHTARANGA-POST:1412]এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ ভাঙনকবলিত এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ সভায় অংশ নেন।
বর্তমানে স্থানীয়দের নজর এখন একটাই—ঘোষণার পর বাস্তব কাজ কত দ্রুত শুরু হয়। কারণ যমুনাপাড়ের মানুষের কাছে সময় মানেই আরেকটি বর্ষা, আরেকটি ভাঙনের আশঙ্কা।