দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

যশোরে ১২ লাখ টাকার জেলি পুশ করা চিংড়ি জব্দ, চার ট্রাকে চলছিল ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের চেষ্টা

যশোরে বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত জেলি পুশ করা চিংড়ি মাছ জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অভিযানে প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি গলদা, বাগদা ও হরিনা জাতের চিংড়ি উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১১ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে জব্দ করা মাছ ধ্বংস করা হয়।শনিবার পরিচালিত এ অভিযানে চারটি মাছবাহী ট্রাক আটক করা হয়। একইসঙ্গে ট্রাক মালিকদের কাছ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। বিজিবি বলছে, মানুষের খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জেলি মিশিয়ে মাছের ওজন বাড়ানোর অপচেষ্টা ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানযশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি) সূত্র জানায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সাতক্ষীরা এলাকা থেকে চিংড়ি মাছ সংগ্রহ করে সেগুলোতে ক্ষতিকর জেলি জাতীয় পদার্থ পুশ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন তথ্য পাওয়ার পর বিজিবির একটি বিশেষ আভিযানিক দল যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসায়।[TECHTARANGA-POST:1333]চেকপোস্টে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটগামী মাছবাহী কয়েকটি ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় চারটি ট্রাকে থাকা বিপুল পরিমাণ চিংড়ি মাছ সন্দেহজনক মনে হলে তা পরীক্ষা করা হয়।পরে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এবং খামার ব্যবস্থাপকের উপস্থিতিতে মাছগুলো পরীক্ষা করে জেলি পুশের সত্যতা পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।কীভাবে ধরা পড়ে জেলি পুশের বিষয়টিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত চিংড়ি মাছের ওজন বাড়িয়ে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে কিছু ব্যবসায়ী মাছের শরীরে জেলি বা রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করিয়ে থাকে। বাইরে থেকে মাছ স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে এসব পদার্থ থাকায় মাছ দ্রুত নষ্ট হয় এবং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।অভিযানে জব্দ করা মাছের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.১ টন বা ১১০০ কেজি। এর মধ্যে গলদা, বাগদা ও হরিনা জাতের চিংড়ি ছিল। বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১১ লাখ টাকা।ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ট্রাক মালিকদের মোট ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে অভিযানে কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।জনস্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগখাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে মাছ, ফল ও মাংসে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি প্রায়ই সামনে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিংড়িতে জেলি বা রাসায়নিক পুশ করা হলে তা মানুষের কিডনি, লিভার ও হজমতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।স্থানীয় কয়েকজন ক্রেতা জানান, বাজারে অনেক সময় অস্বাভাবিক বড় আকারের চিংড়ি দেখা যায়, যেগুলো দেখতে সতেজ মনে হলেও রান্নার পর স্বাদ ও গঠন অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তাদের দাবি, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি না থাকলে এ ধরনের প্রতারণা আরও বাড়তে পারে।একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সব ব্যবসায়ী এমন কাজ করেন না। কিন্তু কিছু অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে পুরো মাছ ব্যবসাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে।”বিজিবির বক্তব্যযশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান, পিএসসি বলেন, চিংড়ি মাছে বিষাক্ত জেলি পুশ করা গুরুতর অপরাধ। এটি শুধু প্রতারণাই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি।তিনি জানান, সহকারী কমিশনার (ভূমি), এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি), সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জব্দ করা মাছ ধ্বংস করা হয়েছে।তার ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে যাতে কেউ ভেজাল খাদ্য বা চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে, সে জন্য বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।পৃথক অভিযানে লক্ষ্য টাকার  পণ্য জব্দএকই দিনে বেনাপোল আইসিপি এলাকায় বিজিবির আরেকটি অভিযানে বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল শাড়ি, থ্রি-পিস, টু-পিস, জিরা, ফুসকা, চকলেট ও কসমেটিকস সামগ্রী।বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকা থেকে এসব পণ্য উদ্ধার করা হয়। জব্দকৃত মালামালের মোট মূল্য প্রায় ১২ লাখ ৩ হাজার ২০০ টাকা।তবে এসব পণ্যের সঙ্গে কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।সীমান্ত জুড়ে নজরদারি বাড়ানোর দাবিসীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান ও অবৈধ খাদ্য পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, বাজার পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং এবং সরবরাহ চেইনেও নজরদারি বাড়াতে হবে।খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা কয়েকজন ব্যক্তি মনে করছেন, ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ অনেক ক্রেতাই বুঝতে পারেন না কোন মাছ বা খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1332]বিশ্লেষকদের মতে, লাভের আশায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা বন্ধ না হলে তা একসময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এ ধরনের রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।তদন্ত ও নজরদারি অব্যাহতপ্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সীমান্ত এলাকা ও মাছ পরিবহন রুটে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। বিজিবি জানিয়েছে, জনস্বাস্থ্যবিরোধী কার্যক্রম, ভেজাল খাদ্য পরিবহন এবং চোরাচালান ঠেকাতে ভবিষ্যতেও এমন অভিযান চলবে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি থাকলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

যশোরে ১২ লাখ টাকার জেলি পুশ করা চিংড়ি জব্দ, চার ট্রাকে চলছিল ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের চেষ্টা